সময়ের কাঁটায় বিলাসিতা: কেন কোটি টাকার ঘড়ির পেছনে ছোটে মানুষ

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: এআই জেনারেটেড
0

সময় বহমান। কিন্তু সেই সময়কে ধারণ করার মাধ্যমটি যদি হয় হীরা, প্ল্যাটিনাম, বিরল কারুকাজ কিংবা শত বছরের ঐতিহ্যে মোড়া কোনো টাইমপিস; তবে তার মূল্য আর শুধু ঘণ্টা, মিনিট কিংবা সেকেন্ডের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বের নামকরা ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ঘড়ির দাম পৌঁছে যায় কোটি কোটি টাকায়, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। প্রশ্ন হলো, যখন সামান্য দামেই সময় দেখার ঘড়ি পাওয়া যায়, তখন কেন মানুষ বিলাসবহুল ঘড়ির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে? ঘড়ি কি কেবল সময় জানানোর যন্ত্র; নাকি এটি ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অবস্থান, রুচি ও আত্মপরিচয়েরও প্রতীক?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিলাসবহুল ঘড়ির প্রতি মানুষের আকর্ষণের পেছনে কাজ করে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা কারণ। কারও কাছে এটি সাফল্যের প্রতীক, কারও কাছে পারিবারিক ঐতিহ্য, আবার কারও কাছে এটি শিল্প ও প্রকৌশলের অসাধারণ নিদর্শন। একটি দামি ঘড়ি অনেক সময় মানুষের আত্মবিশ্বাস, অর্জন ও পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

আজকের আয়োজন সেই বিলাসবহুল টাইমপিসের জগত, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সময়কে ঘিরে তৈরি হওয়া এক ভিন্ন সংস্কৃতিকে নিয়ে।

ঘড়ির দুনিয়ায় যারা বুঝদার, তারা ভালো করেই জানেন; এই বিলাসবহুল ঘড়িগুলো কেবল চড়া দামের জন্য বিখ্যাত নয়। এগুলো একেকটি জ্যান্ত ইতিহাস, অসামান্য যান্ত্রিক কারিগরি এবং পরিধানকারীর ব্যক্তিত্বের চূড়ান্ত ঘোষণা। সময় দেখার জন্য আজ সবার পকেটেই স্মার্টফোন থাকলেও কবজিতে কোটি ডলারের ঘড়ি পরার অর্থ হলো এক অনন্য শিল্পকর্ম ও ঐতিহ্যকে ধারণ করা। চলুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও ঐতিহাসিক ১০ লাক্সারি ঘড়ির আলাপে ঝাঁপ দিই।

গ্রাফ ডায়মন্ডস হ্যালুসিনেশন |ছবি: সংগৃহীত

১. গ্রাফ ডায়মন্ডস হ্যালুসিনেশন (Graff Diamonds Hallucination)

মূল্য : ৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা)

২০১৪ সালে বাসেলওয়ার্ল্ডে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোয়ার্টজ ঘড়ি হিসেবে এটি প্রথম উন্মোচিত হয়, যার আনুমানিক মূল্য ৫৫ মিলিয়ন ডলার। এতে ১১০ ক্যারেটের অত্যন্ত বিরল ও বড় আকৃতির রঙিন হীরা প্ল্যাটিনাম ব্রেসলেটে বসানো হয়েছে। হীরার রঙের মধ্যে রয়েছে ফ্যান্সি ভিভিড ইয়েলো, ফ্যান্সি ইনটেনস পিঙ্ক, ফ্যান্সি ইনটেনস ব্লু, ফ্যান্সি গ্রিন ও ফ্যান্সি অরেঞ্জসহ নানা বিরল রং। হীরাগুলো হার্ট শেপ, পেয়ার শেপ, মার্কিজ, এমারেল্ড, রেডিয়ান্ট ও রাউন্ডসহ বিভিন্ন কাটে তৈরি। এই অনন্য টাইমপিসটি তৈরির পরিকল্পনা ছিল গ্রাফ ডায়মন্ডসের চেয়ারম্যান লরেন্স গ্রাফের। এর ক্ষুদ্র কোয়ার্টজ ডায়ালটি গোলাপি হীরার ফ্রেমে প্রায় ঢাকা পড়ে থাকে।

গ্রাফ ডায়মন্ডস দ্য ফ্যাসিনেশন |ছবি: সংগৃহীত

২. গ্রাফ ডায়মন্ডস দ্য ফ্যাসিনেশন (Graff Diamonds The Fascination)

মূল্য: ৪ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা)

বাসেলওয়ার্ল্ড ২০১৫-এ উন্মোচিত এই ঘড়িটিতে ১৫২.৯৬ ক্যারেটের অত্যন্ত উচ্চমানের সাদা হীরা এবং কেন্দ্রে একটি বিরল ৩৮.১৩ ক্যারেটের ডি ফ্ললেস নাশপাতি আকৃতির হীরা রয়েছে, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান রূপান্তরযোগ্য টাইমপিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, কেন্দ্রের নাশপাতি আকৃতির হীরাটি ব্রেসলেট থেকে আলাদা করে বিশেষ শ্যাঙ্কে বসিয়ে আংটি হিসেবে পরা যায়। আবার একটি হীরাখচিত ওয়াচ ফেস বসিয়ে এটিকে ঘড়িতেও রূপান্তর করা যায়।

পাটেক ফিলিপ গ্র্যান্ডমাস্টার চিম রেফ. ৬৩০০এ-০১০ |ছবি: সংগৃহীত

৩. পাটেক ফিলিপ গ্র্যান্ডমাস্টার চিম রেফ. ৬৩০০এ-০১০ (Patek Philippe Grandmaster Chime Ref. 6300A-010)

মূল্য: ৩ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৭২ কোটি টাকা)

এটি পাটেক ফিলিপ ৬৩০০এ—অনলি ওয়াচ ২০১৯-এর জন্য তৈরি এক অনন্য স্টেইনলেস স্টিল গ্র্যান্ডমাস্টার চিম। সিএইচএফ ৩১ মিলিয়ন (প্রায় ৩১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) হ্যামার প্রাইসে বিক্রি হয়ে এটি নিলামে বিক্রি হওয়া সর্বকালের সবচেয়ে দামি ঘড়ির রেকর্ড গড়ে। ঘড়িটি বিশেষভাবে এই চ্যারিটি নিলামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং এটিই প্রথম ও একমাত্র স্টেইনলেস স্টিলে তৈরি গ্র্যান্ডমাস্টার চিম। পাটেক ফিলিপের ১৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে মূল গ্র্যান্ডমাস্টার চিম প্রথম তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে। এতে ২০টি কমপ্লিকেশন রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি চাইমিং মোড উল্লেখযোগ্য, যার দুটি পেটেন্ট করা বিশ্ব-প্রথম উদ্ভাবন। এর দুটি ডায়াল রোজ গোল্ড ও কালো এবনিতে তৈরি এবং এতে ২০টি কমপ্লিকেশন প্রদর্শিত হয়।

ব্রেগে গ্র্যান্ড কমপ্লিকেশন মারি আঁতোয়ানেত নং ১৬০ |ছবি: সংগৃহীত

৪. ব্রেগে গ্র্যান্ড কমপ্লিকেশন মারি আঁতোয়ানেত নং ১৬০ (Breguet No. 160 "Marie Antoinette")

মূল্য: ৩ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা, আনুমানিক মূল্যায়ন)

১৭৮৩ সালে রাণী মারি আঁতোয়ানেতের রক্ষীবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এই ঘড়িটির অর্ডার দিয়েছিলেন, যার পরিচয় আজও অজানা। এতে সময় বা অর্থের কোনো সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি। নির্দেশনা ছিল, সম্ভাব্য সব কমপ্লিকেশন যুক্ত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব সোনা ব্যবহার করতে হবে। ১৮২৭ সালে, রানী ও ঘড়ি নির্মাতা আব্রাহাম-লুই ব্রেগে উভয়ের মৃত্যুর অনেক পরে, ৬০ মিলিমিটার পকেট ঘড়িটির কাজ শেষ হয়, যাতে ২৩টি কমপ্লিকেশন ও ৮২৩টি যন্ত্রাংশ ছিল। ১৯৮৩ সালের ১৭ এপ্রিল জেরুজালেমের এল.এ. মেয়ার ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক আর্ট থেকে এটি ১০৫টি অন্যান্য বিরল ঘড়িসহ চুরি হয়ে যায়। ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বর, চুরির ২৪ বছর পর, ঘড়িটি উদ্ধার হয়।

জেগার-ল্যুকুলত্র জোয়াইলেরি ১০১ ম্যানচেট |ছবি: সংগৃহীত

৫. জেগার-ল্যুকুলত্র জোয়াইলেরি ১০১ ম্যানচেট (Jaeger-LeCoultre Joaillerie 101 Manchette)

মূল্য: ২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩১২ কোটি টাকা)

১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে এই অনন্য ব্রেসলেট ঘড়িটি উপহার দেয়া হয়েছিল। এতে ব্যবহার করা হয়েছে ক্যালিবার ১০১— বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্রতম মেকানিক্যাল মুভমেন্ট, যা একটি জটিল হীরাখচিত ব্রেসলেটে বসানো। ঘড়িটিতে ৫৭৬টি হীরা ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাজকীয় আভিজাত্যের এক চূড়ান্ত উদাহরণ।

শোপার্ড ২০১ ক্যারেট ওয়াচ |ছবি: সংগৃহীত

৬. শোপার্ড ২০১ ক্যারেট ওয়াচ (Chopard 201-Carat Watch)

মূল্য: ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০০ কোটি টাকা)

২০০০ সালে তৈরি শোপার্ডের এই ঘড়িটির মূল্য ২৫ মিলিয়ন ডলার। এতে মোট ২০১ ক্যারেটের ৮৭৪টি হীরা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ তিনটি হার্ট-শেপ হীরা— ১৫ ক্যারেটের গোলাপি, ১২ ক্যারেটের নীল এবং ১১ ক্যারেটের সাদা— যেগুলো খুলে গিয়ে ভেতরের প্যাভে-সেট ওয়াচ ফেস এবং তিনটি নাশপাতি আকৃতির হলুদ হীরা প্রকাশ করে।

পাটেক ফিলিপ হেনরি গ্রেভস সুপারকমপ্লিকেশন |ছবি: সংগৃহীত

৭. পাটেক ফিলিপ হেনরি গ্রেভস সুপারকমপ্লিকেশন (Patek Philippe Henry Graves Supercomplication)

মূল্য : ২ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা)

নিউ ইয়র্কের ব্যাংকার ও ঘড়ি সংগ্রাহক হেনরি গ্রেভস জুনিয়র ১৯৩৩ সালে পাটেক ফিলিপকে দিয়ে এই পকেট ঘড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন, মূলত সহ-ধনকুবের জেমস ওয়ার্ড প্যাকার্ডকে ছাড়িয়ে যেতে। এতে ২৪টি কমপ্লিকেশন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ওয়েস্টমিনস্টার চাইম, পারপেচুয়াল ক্যালেন্ডার, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় এবং গ্রেভসের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের বাসভবন থেকে দেখা নিউ ইয়র্কের রাতের আকাশের সেলেস্টিয়াল চার্ট। ২০১৪ সালে সোথবি’স নিলামে এটি সিএইচএফ ২৩.২ মিলিয়নে বিক্রি হয়ে তৎকালীন সর্বকালের সবচেয়ে দামি ঘড়ির রেকর্ড গড়েছিল।

জ্যাকব অ্যান্ড কোং বিলিয়নেয়ার ওয়াচ |ছবি: সংগৃহীত

৮. জ্যাকব অ্যান্ড কোং বিলিয়নেয়ার ওয়াচ (Jacob & Co. Billionaire Watch)

মূল্য : ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ২১৬ কোটি টাকা)

জ্যাকব অ্যান্ড কোং-এর তৈরি এই ঘড়িটিতে ১৮ ক্যারেট সাদা সোনার কেস ও ব্রেসলেটে মোট ২৬০ ক্যারেটের এমারেল্ড-কাট হীরা বসানো হয়েছে। এর ভেতরে রয়েছে একটি কঙ্কালসদৃশ (Skeletonized) ট্যুরবিয়ন মুভমেন্ট, যা ঘড়ির যান্ত্রিক নিখুঁততাকে বাইরে থেকে দৃশ্যমান করে তোলে। ঘড়িটি ১৮ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে এবং এর ক্রেতা বিখ্যাত বক্সার ফ্লয়েড মেওয়েদার।

রলেক্স পল নিউম্যান ডেটোনা রেফ. ৬২৩৯ |ছবি: সংগৃহীত

৯. রলেক্স পল নিউম্যান ডেটোনা রেফ. ৬২৩৯ (Rolex Paul Newman Daytona Ref. 6239)

মূল্য: ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ২১৩ কোটি টাকা)

হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ও রেসিং ড্রাইভার পল নিউম্যানের ব্যক্তিগত ঘড়ি ছিল এটি। তার স্ত্রী ও অভিনেত্রী জোয়ান উডওয়ার্ড ঘড়িটি তাকে উপহার দিয়েছিলেন যখন তিনি ১৯৭২ সালে রেসিং শুরু করেন। এর কেসব্যাকে খোদাই করা ছিল ‘DRIVE CAREFULLY ME’। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ফিলিপস অকশন হাউজে ঘড়িটি বায়ার্স প্রিমিয়ামসহ ১৭,৭৫২,৫০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। এর মধ্য দিয়ে এটি তৎকালে বিশ্বের সবচেয়ে দামি রিস্টওয়াচের রেকর্ড গড়ে।

পাটেক ফিলিপ স্টেইনলেস স্টিল রেফ. ১৫১৮ |ছবি: সংগৃহীত

১০. পাটেক ফিলিপ স্টেইনলেস স্টিল রেফ. ১৫১৮ (Patek Philippe Stainless Steel Ref. 1518)

মূল্য: ১ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা) — ২০১৬ সালের নিলাম মূল্য

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে পাটেক ফিলিপ এই সিরিজটি তৈরি শুরু করে। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম পারপেচুয়াল ক্যালেন্ডার ক্রোনোগ্রাফ রিস্টওয়াচ, যা লিপ ইয়ারসহ সব ক্যালেন্ডার নিজে নিজেই হিসাব করতে পারে। সাধারণত পাটেক ফিলিপ সোনা বা প্ল্যাটিনাম দিয়ে ঘড়ি তৈরি করলেও এই সিরিজের মাত্র ৪টি ঘড়ি স্টেইনলেস স্টিলে তৈরি হয়েছিল, যা সংগ্রাহকদের কাছে এর মূল্য আকাশচুম্বী করেছে। ২০১৬ সালে ফিলিপস নিলামে এটি ১১,১৩৬,৬৪২ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়।

দামি ঘড়ির আসল রহস্য

লাক্সারি ঘড়ির মূল্য শুধু সোনা বা হীরায় নিহিত নয়। এর আসল দাম লুকিয়ে থাকে ‘হোরোলজি’ বা ঘড়ি তৈরির বিজ্ঞান, শত বছরের ঐতিহ্য এবং ঘড়ির অভ্যন্তরে থাকা হাজারো সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের নিখুঁত যান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে। এখানে দাম নয়, ব্যক্তিত্ব মূখ্য। বিলাসবহুল টাইমপিসগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট, এগুলো কেবল সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যম নয়। একজন মানুষ যখন পাটেক ফিলিপ কিংবা ব্রেগের মতো কোনো ঘড়ি নিজের কবজিতে বাঁধেন, তখন তিনি কেবল সময় দেখেন না; শত বছরের ইতিহাস, দক্ষ কারিগরের হাজার ঘণ্টার শ্রম এবং মানুষের যান্ত্রিক মেধার চূড়ান্ত রূপকে সম্মান জানান।

অন্যদিকে, পল নিউম্যানের রলেক্স আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসা ও রেসিং ট্র্যাকের গল্প; মারি আঁতোয়ানেতের ব্রেগে নিয়ে যায় ফরাসি বিপ্লবের আগের রাজকীয়তায়। তাই ঘড়ির দুনিয়ায় একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘আপনি আসলে কখনই একটি পাটেক ফিলিপের মালিক হন না। আপনি কেবল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটি রক্ষা করেন।’

‘কেন মানুষ কোটি টাকার ঘড়ির পেছনে ছুটে’ এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘সময় দেখা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আধুনিক দুনিয়ায় ঘড়ি অনেক আগেই তার ব্যবহারিক সীমা পেরিয়ে পরিচয়, অবস্থান আর রুচির প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি বিলাসবহুল ঘড়ি অনেক সময় মানুষের সাফল্যের নীরব ঘোষণা। কেউ হয়তো ব্যবসায়িক অর্জন, কেউ ব্যক্তিগত সাফল্য বা পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে এমন ঘড়ি বেছে নেন। এর পেছনে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ, সীমিত উৎপাদন এবং শত বছরের ব্র্যান্ড ইতিহাস; যা এটিকে শুধু একটি পণ্য নয়, বরং একটি শিল্পবস্তুতে পরিণত করে।

মনস্তাত্ত্বিকভাবেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে চায়, আর বিলাসবহুল ঘড়ি সেই প্রকাশের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী মাধ্যম। এটি যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তেমনি সামাজিক স্বীকৃতির অনুভূতিও তৈরি করে। সব মিলিয়ে কোটি টাকার ঘড়ি শুধু সময়ের হিসাব নয়; এটি সময়ের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, স্বপ্ন ও পরিচয়ের গল্পও বলে।

তথ্যসূত্র : সোথবি’স ও ক্রিস্টি’স নিলাম আর্কাইভ, ফিলিপস ওয়াচ অকশন, মনোক্রোম ওয়াচেস, এ ব্লগ টু ওয়াচ, ব্রেগে অফিশিয়াল আর্কাইভ।

এএম

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর
No Article Found!