ঐতিহ্যবাহী টেপাখোলা হাট: ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার

টেপাখোলা হাট
টেপাখোলা হাট | ছবি: এখন টিভি
0

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জমে উঠেছে বৃহত্তর ফরিদপুরের সবচেয়ে বড় গবাদি পশুর হাট শহরের টেপাখোলা হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও ব্যাপারীরা বিপুল সংখ্যক গরু ও মহিষ নিয়ে এসেছেন এই হাটে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদাচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো হাটপ্রাঙ্গণ। জাল টাকা শনাক্তকরণ, সিসি ক্যামেরা ও মেডিকেল টিমসহ হাটে জোরদার করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ঈদুল আজহার আনন্দকে পূর্ণতা দিতে ফরিদপুরের টেপাখোলা পশুর হাটে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, দোহারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় সব গরু ও মহিষ নিয়ে এসেছেন খামারিরা।

হাটে মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে আকর্ষণ বাড়াচ্ছে বিশাল আকৃতির সব গরু ও মহিষ। সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পছন্দের পশু কেনার গুঞ্জন আর হাঁকডাক। ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের গরু বিক্রি হচ্ছে।

আজ (মঙ্গলবার, ১৯ মে) দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয়েছে হাট, চলবে গভীর রাত পর্যন্ত। সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খামারি ও ব্যাপারীরা বিভিন্ন যানবাহনে করে গরু ও মহিষ নিয়ে এসেছেন। কেউবা ট্রাক থেকে গরু নামাচ্ছেন, আবার কেউ গরু বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দামাদামি চলছে, তাদের হাঁকডাকে মুখরিত হাট প্রাঙ্গণ।

ঝিনাইদহ থেকে সাতটি মহিষ নিয়ে এসেছেন বিল্লাল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘সাতটির মধ্যে এখন পর্যন্ত একটি বিক্রি করতে পেরেছি। ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। অন্যগুলোর দামে মিলছে না।’

দোহার থেকে আসা গরু বিক্রেতা আসলাম হোসেন বলেন, ‘৪টি গরু নিয়ে এসেছি, এখন পর্যন্ত একটিও বিক্রি করতে পারিনি। ক্রেতারা দাম কম বলায় বিক্রি করছি না, একটু অপেক্ষা করছি, দেখি দাম কত পাই।’

তার আনা চারটি গরু প্রকারভেদে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম চাচ্ছেন তিনি।

গরু কিনতে আসা শফিকুর রহমান বলেন, ‘হাটের শুরু এ কারণে দাম চাওয়া হচ্ছে বেশি। পরে কিনবো, এখন বিভিন্ন গরু দেখছি। গতবারের চেয়ে দাম বেশি চাচ্ছে খামারিরা। তবে এ দাম থাকবে না।’

আরেক ক্রেতা ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘একটা গরু কিনেছি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে। দাম কমেই পেয়েছি। গতবারের চেয়ে কম দামে কিনতে পেরেছি। বর্তমানে গরুর দাম স্বাভাবিক আছে।’

এদিকে হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পকেটমার বা অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা রোধে পুরো হাট আনা হয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। এছাড়া বড় অঙ্কের লেনদেনে জাল টাকা শনাক্ত করতে বসানো হয়েছে একাধিক বিশেষ মেশিন। ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে পশু বেচা-কেনা করে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে হাট ইজারাদারের পক্ষ থেকে।

টেপাখোলা হাট ইজারাদার গোলাম কুদ্দুস মিয়া জানান, হাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসছেন তাদের সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া পুরো হাট সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তে মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

আরেক ইজারাদার মো. সরোয়ার হোসেন জানান, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও হাট জমতে শুরু করেছে। বেচাকেনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের রাতে থাকার জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এছাড়া হাটে আসা সকলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। হাসিলের ক্ষেত্রে ব্যাপারীদের জন্য গরু প্রতি এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ ক্রেতাদের ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ২ হাজার টাকা হাসিল নেয়া হচ্ছে। কোনো কোনো সময় অনেকের কাছ থেকে এরচেয়ে কমও নেয়া হচ্ছে।

টেপাখোলা হাটে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে নিয়োজিত রয়েছেন ফরিদপুর ২ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই বিপ্লব কীর্তনিয়ার নেতৃত্বে একটি দল।

তিনি বলেন, ‘হাটের সার্বিক অবস্থা ভালো রয়েছে। তারপরও আমরা খেয়াল রাখছি, বিশেষ করে পকেটমার ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা যাতে কোনোভাবেই কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সেবিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি। দূর দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়াই এখান থেকে বাড়ি ফিরতে পারে তার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় ৮ হাজার ১৬৯ জন খামারি রয়েছে। চলতি বছর জেলায় ১ লাখ ৩ হাজার ৩৬১টি গবাদি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। চাহিদা রয়েছে ৯০ হাজার ৮৬৪ টি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশু যাবে অন্য জেলায়।

ফরিদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আসজাদ বলেন, ‘হাটে আসা গবাদি পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থ করতে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে বিশেষ মেডিকেল টিম। পশুর যেকোনো জরুরি চিকিৎসায় তাৎক্ষণিক সেবা দেয়া হচ্ছে। জেলায় ছোট-বড় ৪২ টি গবাদি পশুর হাট বসানো হয়েছে। অন্য হাটগুলোতেও মেডিকেল টিম নিয়োজিত রয়েছে।’

এসএস

আরও পড়ুন:
এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর
No Article Found!