সম্প্রতি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পর্যটননগরী কক্সবাজারে সাইবার অপরাধে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে দুটি আন্তর্জাতিক চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্য। সীমান্তবর্তী এলাকায় বাসা ও হোটেল ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া বিদেশি নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে সাইবার স্ক্যামের সঙ্গে জড়িত থাকার আলামত পাওয়া গেছে।
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন বুঝতে পারি এরা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত আছে, তখন আমরা অভিযান পরিচালনা করি। এরপর দেখা যায় তারা অনলাইন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদের কাছ থেকে আমরা প্রায় ৪ হাজার মোবাইল ফোন উদ্ধার করে সাইবার আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘তারা মূলত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলো।’
তবে কি দেশিয় সাইবার অপরাধীদের সহযোগিতায় বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে অপরাধ চক্র গড়ে তুলছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁচ্ছে সিআইডি। বিভিন্ন দেশের স্ক্যাম সেন্টার বা কম্পাউন্ড থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশিদের সাথে এসব চক্রের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির মিডিয়ার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, ‘সাইবার অপরাধীদের বিষয়টি আমাদের নলেজের মধ্যে আছে। কিছু লোক বাহির থেকে এসে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়াচ্ছে।’
গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে হাজারো মানুষকে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রেখে বিশ্বব্যাপী অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন দেশের তালিকায় রয়েছে— মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস। আছে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার নামও।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, সাইবার ঝুঁকিপূর্ণ এসব দেশের মধ্যে গত ২০ মাসে কম্বোডিয়ায় গেছেন ১৫ হাজার ৯৫৬ জন, লাওসে ৬ হাজার ৭৪৮ জন এবং ভিয়েতনাম গেছেন ২ হাজার ২৯১জন বাংলাদেশি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, চলতি বছর কম্বোডিয়া থেকে ২ হাজার বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। যাদের অধিকাংশেরই দেশটিতে স্ক্যাম সেন্টারে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত দুই বছরে মিয়ানমার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফিরেছেন অন্তত ৪০ বাংলাদেশি।
দক্ষতা নিয়ে ফিরে আসা ভুক্তভোগী কর্মীরা দেশে অপরাধের নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান বলছে, বিদেশ ফেরত স্ক্যাম সেন্টারের টিম লিডার ও সুপারভাইজাররা টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলা, রংপুর সদর উপজেলা ও নোয়াখালী বেগমগঞ্জ উপজেলায় অপরাধ চক্র গড়ে তুলেছে।
ভবিষ্যতে এ অপরাধ মারাত্মক আকার ধারণ করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখার পরামর্শ অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল আমিন নয়ন বলেন, ‘যারা ফিরে আসছে তারা সবাই সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত না। আমাদের করণীয় হলো যারা ফিরে আসে তাদেরকে ফলো আপে রাখা আর নজরদারিতে রাখা।’
দেশিয় চক্রের যোগসাজশে তৈরি করছে অপরাধ জগতের নেটওয়ার্ক। এখনই সচেতনতা গড়ে তোলা না গেলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়বে, বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘এখনই যদি এর জন্য ব্যবস্থা না নেয়া হয় তাহলে এজন্য ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইটি খাতের অপব্যবহার রোধ করার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের অনলাইন ব্যবহারে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।





