বিএনপির উত্থান-পতনের ৪৮ বছর: নতুন বাস্তবতায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি

বিএনপির উত্থান-পতনের ৪৮ বছর
বিএনপির উত্থান-পতনের ৪৮ বছর | ছবি: এখন টিভি
0

দীর্ঘ পথচলার ৪৮ বছর পূর্ণ হলো বিএনপির। ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত দলটি নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য এসেছে নতুন বাস্তবতা ও দায়িত্বের বার্তা নিয়ে। তারা জানান, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলমান রয়েছে। আর এসব প্রস্তুতি শেষ করে দ্রুতই হবে বিএনপির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল।

উনিশশো আটাত্তর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক অস্থির সময়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির। পহেলা সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

প্রতিষ্ঠার পর দ্রুতই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে জায়গা করে নেয় বিএনপি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের হাল ধরেন তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া।

এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। রাজপথে দীর্ঘ সংগ্রাম। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।

দুই হাজার আটের নির্বাচনের পর রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিরোধী দল হিসেবে কঠিন সময় পার করে বিএনপি। মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দলটির রাজনীতিতে তৈরি হয় গভীর সংকট।

একদিকে নেতৃত্বের সংকট, অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলন, সব মিলিয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করে দলটি। আর সেই সময়েই দলের নেতৃত্বে ক্রমশ সামনে আসেন তারেক রহমান।

দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার পর তারেক রহমান এখন বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর দলের রাজনীতিতে এসেছে নতুন অধ্যায়। অতীতের আন্দোলন, ক্ষমতায় থাকা, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি আর প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে।

জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘সরাসরি ভোট বা নির্বাচনের মাধ্যমে যখন সংগঠন দাঁড় করাবে, তখন এই যে যে সমস্ত আগাছা—যারা চিটা, মানে যেগুলো থাকে না ধানে, এই টাইপের লোকরা এমনি বের হয়ে যায়।’

দলটির হাইকমান্ড বলছেন, গেলো ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো এখন নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সেই লক্ষ্যেই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে কাজ চলছে।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘অসংখ্য ঘটনা আছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জেলে নেয়া হয়েছে, মাসের পর মাস। কত সহকর্মী আমাদের খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, আহত হয়েছে, কারা নির্যাতিত হয়েছে, নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবং সেই সময়ের প্রায়োরিটি ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সুসংহত এবং জোরদার করা।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানান, ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে গুরুত্বপূর্ণ শূন্য পদে নেতৃত্ব নির্বাচন ও দলের জাতীয় কাউন্সিলকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি শেষ করে শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে বিএনপির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘খুব স্পষ্টভাবে আমরা অনুভব করেছি এবং আমাদের সিদ্ধান্তও হয়েছে যে, আমরা যত দ্রুত সম্ভব দলের কাউন্সিল করে দলের নেতৃত্বে অনেক জায়গায় শূন্যতা আছে। শূন্য পদ আছে, সেগুলো আমরা পূরণ করে নতুন যারা যোগ্য আছে আমাদের মধ্যে, তাদেরকে দিয়ে দলটাকে আরও শক্তিশালী করা।’

দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলছেন হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারী নয়, দলকে সুসংগঠিত করতে যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে।

বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘হাইব্রিডরা চেষ্টা নেয় নানাভাবে এটা ঢোকার জন্য। তো এ ব্যাপারে দল অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। অত্যাচারিত যারা হয়েছেন, নিপীড়িত যারা হয়েছেন, নানাভাবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেখানে হাইব্রিডরা এসে দলের বিভিন্ন পদ-পদবি সেগুলো নিয়ে যাবেন, তারা এসে মাতব্বরি করবেন—এটা কখনোই সম্ভব না।’

রাজনৈতিক বাকবদলের ইতিহাসে ৪৮ বছরের পথচলা বিএনপির। এখন দলটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর রাজনীতি এমনটি বলছেন বিশ্লেষকরা।

এফএস