সবকিছুর শুরু এখানেই। বুড়িগঙ্গার বুক চিরে গড়ে উঠেছিলো ঢাকার প্রাণ। সরু গলি, ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য আর ইতিহাস, সব মিলিয়ে পুরান ঢাকা ছিলো এক জীবন্ত নগর।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ বেড়েছে, ভবন বেড়েছে, কমেছে খোলা জায়গা। অপরিকল্পিত ভবন, অগ্নিঝুঁকি, সংকীর্ণ রাস্তা, যানজট, বায়ুদূষণে ধীরে ধীরে বসবাসের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে এক সময়ের প্রাণকেন্দ্র। মৌলিক অধিকার গুলোও যেন হারিয়ে গেছে মাত্র কয়েকদশকে।
স্থানীয়রা জানান, নতুন শহরে যেরকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কথা, তার কিছুই তারা পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন, ফুটপাতে ভ্রাম্যমান দোকান দিয়ে ভরা। এতে সাধারণ মানুষ সাধারণভাবে চলাফেলা করতে পারেন না।
একসময়ের জীবন্ত নগর যখন নুইয়ে পড়ল অল্প বয়সে ভারে, তখন প্রশ্ন উঠলো ঢাকার ভবিষ্যৎ কি অন্য কোথাও?
স্বস্তির শ্বাস নিতে মানুষ পা বাড়ালো নতুন শহরে। নগর ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিমে, উত্তরে। গড়ে উঠল উত্তরা, মিরপুরের মত নতুন নতুন আবাসিক এলাকা। একসময় যেগুলোকে বলা হয়েছিলো পরিকল্পিত ঢাকা। কিন্তু কয়েক দশক পর আবারও একই অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে যেমন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তা তারা পাননি। এছাড়া বঞ্চিত হচ্ছেন মৌলিক অধিকারগুলো থেকেও।
ঘর থেকে বেরুলেই এখানে থমকে যায় পথ। যানজটে সড়ক অবরোধ, হাঁটার পথও বন্ধ দখলে। ডেঙ্গুতে মৃত্যু যেন নিত্য দিনের আহাজারি। কোথাও কোথাও অপরাধের আতঙ্ক।
এখন অল্প বৃষ্টিতেও ঢুবে যায় ঢাকা। খাল দখল কিংবা মনমর্জির অট্টালিকা কোনোকিছুতেই যেন খেয়াল নেই এই শহরের। আধুনিকতার বদলে এই শহরও হাটছে পুরান ঢাকার পথেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা অগ্রগামী না হয়ে পেছনের যাওয়ার দায় রাষ্ট্র ও সমাজের। একমুখি যোগাযোগ ব্যবস্থাই ছিলো প্রথম ভুল। যদিও নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় সব থেকে বেশি।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আমাদের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পাশাপাশি ওয়াসা বা পরিবেশ অধিদপ্তর কেউ-ই কিন্তু কাজটি করেনি। এই কাজ না করার পেছনে তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, দেশ এবং শহরের প্রতি ভালোবাসার অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলা—সবকিছু মিলেই এখন দেখা যাচ্ছে, ঢাকার নগরায়নকে আমরা অপরিকল্পিত নগরায়ন বলি। কিন্তু শব্দটা আসলে হওয়া উচিত—স্বেচ্ছাচারী নগরায়ন বা দুর্নীতিগ্রস্ত নগরায়ন।’
পরিকল্পনা, আইন প্রয়োগ, নাগরিক সচেতনতা এবং সুশাসনের ওপর জোর দিয়ে যে শহর গড়ে উঠার কথা ছিল তা কেন হয়ে উঠল না, উত্তরে ঢাকা গড়ার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বলছে নিজেদের গাফিলতির কথা।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘সংস্থা হিসেবে তো রাজউকের অবশ্যই কিছু ব্যর্থতা আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে এই ব্যর্থতার জন্য ভূমি মালিক বা বাড়ির মালিকরাও দায়ী। সেইসঙ্গে রাজউকের পরিদর্শন টিমও দায়ী। এখানে দুটো মিলেই একটা যোগসাজস বা যাই বলি, এটা হচ্ছে।’
এবার বয়সের ভারে নুইয়ে আগেই পরবর্তী ঠিকানা খুঁজছে ৩ কোটি মানুষের এই শহর, দৃষ্টি পূর্বদিকে, নাম পূর্বাচল।
প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক অবকাঠামো, পরিকল্পিত নগর। অনেকের চোখে এটাই ভবিষ্যতের ঢাকা। এখানে নতুন স্বপ্ন দেখছেন হাজারো মানুষ। তবে আছে হতাশার গল্প।
কিন্তু পুরান ঢাকার পর নতুন ঢাকা, আর ঢাকার পর পূর্বাচল। শহর বদলেছে। কিন্তু বদলেছে কি ব্যবস্থাপনা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসযোগ্য নগরের জন্য শুধু শহর বদল নয়, রাজনীতির ঊর্ধ্বেই ভাবতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে।
স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর বলেন, ‘রাষ্ট্রই তো সবকিছু। যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকেন, তারা চাইছেন কি না সেটা হচ্ছে বড় প্রশ্ন। এমন পরিকল্পনা দরকার যেখানে সত্যিকার অর্থে উদাহরণ গড়াই এখন মনে হচ্ছে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলেও হতে পারে।’
একটি শহর শুধু ইট, বালু আর কনক্রিট দিয়েই তৈরি হয় না; শহর তৈরি হয় পরিকল্পনা, আইনের প্রয়োগ, সুশাসন এবং সচেতনতার ওপর। এসব ছাড়া শুধু জায়গা বদলালেই বদলাবে না ঢাকার ভবিষ্যৎ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আজকে যে স্বপ্নের নাম পূর্বাচল, আগামী কয়েক দশক পর সেই স্বপ্ন কি পরিণত হবে একটি পুরান ঢাকা বা নতুন ঢাকায়? নাকি বদলাবে ইতিহাস?—সেটি দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দশক।





