প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরভিত্তিক দুর্ঘটনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১ হাজার ৪৬৩ জন। ২০২১ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮টিতে, নিহত হন ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ৩ হাজার ৯১ জনের। ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৪৮৭ জন এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ২ হাজার ৬০৯ জনের। এরপর ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৯টিতে; ওই বছর নিহত হন ২ হাজার ৬৭১ জন। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬ হাজার ৩১৪টি অর্থাৎ প্রায় ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে ভারী যানবাহনের ধাক্কার কারণে। এ ছাড়া ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ (৫ হাজার ৪৯৭টি) দুর্ঘটনায় চালক মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ বা ৩ হাজার ৫৪৮টি। বাকি ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ (৭০৬টি) দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য কারণে।
দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবে দেখা যায়, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্র্যাক্টর, ট্রলি ও লরির মতো পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে ঘটেছে ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ (৬ হাজার ৪৮১টি) দুর্ঘটনা। মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বা ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনার জন্য। বাসচালকদের কারণে ঘটেছে ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ (২ হাজার ১৬৪টি), থ্রি-হুইলারের কারণে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ (৭৩২টি), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স-জিপের কারণে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ (৪৩৮টি), পথচারীর কারণে ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ (২৯৬টি) এবং বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ (১২৩টি) দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এই সড়কে দুর্ঘটনার হার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ বা ৬ হাজার ৬৮৯টি। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ (৪ হাজার ৭৭৩টি), শহরের সড়কে ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ (২ হাজার ৬৪৬টি) এবং গ্রামীণ সড়কে ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ (১ হাজার ৯৫৭টি) দুর্ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেলের বড় একটি অংশ চালান কিশোর ও যুবকেরা। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশই ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষাভঙ্গি কিশোর-যুবকদের অতিরিক্ত গতিতে বাইক চালাতে উৎসাহিত করছে। এতে তারা গতির মধ্যে রোমাঞ্চ অনুভব করেন। ফলে বাইকচালকরা নিজে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি পথচারীসহ সড়কের অন্য ব্যবহারকারীদেরও দুর্ঘটনার শিকার করছেন।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারাও বেপরোয়া যানবাহন চালিয়ে মোটরসাইকেলকে চাপা-ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এ ছাড়া গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়া এবং যানজটের কারণেও মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে ঝুঁকছেন।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে—কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, নজরদারিতে প্রযুক্তির অভাব, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি এবং অসহনীয় যানজট।
পরিস্থিতি উত্তরণে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে—মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিটিআরসির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুরক্ষা প্রচারণা চালানো, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন চালু করা।





