শিশুহত্যা ও যৌন নির্যাতন; ৬ মাসেই ভাঙলো বিগত বছরের রেকর্ড

‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদন

সংবাদ সম্মেলন
সংবাদ সম্মেলন | ছবি : সংগৃহীত
0

দেশে শিশুদের জন্য নিরাপত্তার সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি থেকে জুন) শিশুহত্যা ও যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান বিগত বছরের পুরো এক বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, শিশুদের জন্য দেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অরক্ষিত স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তাদের নিজস্ব ঘর বা পারিবারিক পরিবেশ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী হিসেবে ধরা পড়েছে তাদের অতি পরিচিত মানুষজন।

শিশু অধিকার, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘শিশুরাই সব’র হালনাগাদ মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক তথ্য উঠে এসেছে। দেশের ৫৬টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল এবং টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৭৮টি পৃথক শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মোট ৮৬ জন শিশু নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের পুরো ১২ মাসে সারা দেশে শিশুহত্যার সংখ্যা ছিল ১২৪।

গড় হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ১১ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি মাসে প্রায় ১৪ জনে।

নিহত ৮৬ জন শিশুর মধ্যে ৪৭ জন মেয়ে শিশু (৫৫.২৯ শতাংশ) এবং ৩৬ জন ছেলে শিশু (৪১.১৮ শতাংশ)। বাকি ৩ জন শিশুর লিঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বয়সের দিক থেকে ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে (৪৬ জন বা ৫১.৬১ শতাংশ)। এরপর ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৩০ জন (২৯.৮৪ শতাংশ) এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১০ জন (৯.৬৮ শতাংশ) শিশু মারা গেছে।

শিশুহত্যার প্রায় ৫০.৫৯ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে পারিবারিক পরিসরে বা ঘরের ভেতর (নিজ বাড়ি বা আত্মীয়ের বাসা)। এছাড়া ৪১.১৮ শতাংশ ঘটেছে খোলা বা জনপরিসরে (রাস্তা, ঝোপঝাড়, জলাশয়) এবং ৭.১০ শতাংশ অন্যান্য স্থানে।

রাগ, ক্ষোভ বা দাম্পত্য ঝগড়ার বলি হয়ে মারা গেছে ২২.০৯ শতাংশ শিশু (১৯টি ঘটনা)। ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট বা ধর্ষণের চেষ্টা করতে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে ২০.৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে (১৮ জন)। এছাড়া সরাসরি শারীরিক নির্যাতনে ১৬.২৭ শতাংশ (১৪ জন), পরকীয়ায় ৪.৬৫ শতাংশ (৪ জন), জমিজমা বিরোধে ৪.৬৫ শতাংশ (৪ জন) এবং অন্যান্য ও অনিশ্চিত কারণে ২৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

বিভাগ হিসেবে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি (২২ জন) এবং সিলেট ও বরিশালে সর্বনিম্ন (৬ জন করে) শিশুহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছরের প্রথম অর্ধে ৩১২টি পৃথক যৌন নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ৩৩৬ জন শিশু মারাত্মকভাবে নির্যাতিত হয়েছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩০৮। অর্থাৎ গত এক বছরের মোট ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে এই ছয় মাসের নির্মমতা।

মোট নির্যাতনের মধ্যে ৫৬.৮৫ শতাংশ সরাসরি ধর্ষণ (১৯১ জন), ২২.৩২ শতাংশ ধর্ষণ চেষ্টা (৭৫ জন), ১৩.১০ শতাংশ একাধিকবার ধর্ষণ (৪৪ জন) এবং ৭.৭৫ শতাংশ দলগত ধর্ষণের শিকার (২৬ জন)।

আরও পড়ুন:

৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে (১৭৫ জন বা ৫২.০৮ শতাংশ)। ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু রয়েছে ৯০ জন (২৬.৭৯ শতাংশ) এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী রয়েছে ৪১ জন (১২.২০ শতাংশ)। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে ১২৭ জন মেয়ে শিশু (৩৭.৮০ শতাংশ) এবং ২৪ জন ছেলে শিশু (৭.১৪ শতাংশ) চিহ্নিত হলেও ১৮৫ জন শিশুর (৫৫.০৬ শতাংশ) লিঙ্গ পরিচয় সংবাদের তথ্যে স্পষ্ট করা হয়নি।

যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ৩২ জন শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, ১১ জন শিশু গর্ভধারণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং ২ জন শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এছাড়া বিগত ৬ মাসে অন্তত ১৬ জন শারীরিক, বুদ্ধি বা বাক-প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।

চকোলেট, টাকা, চিপস, বিস্কুট বা আম কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২৩.৬১ শতাংশ শিশুকে নির্যাতন করা হয়। ৩৬.৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে একা পেয়ে কৌশলে এবং ১৮.৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভয় দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেইল করে নির্যাতন চালানো হয়। ৪২.৮৬ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে নিজ বাড়ি কিংবা অপরাধীর ঘরে। এছাড়া রাস্তা বা ঝোপঝাড়ে ২৪.৪০ শতাংশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১১.৬১ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন:

প্রতিবেদনের একটি ভয়ঙ্কর সত্য তুলে ধরেছে যে, শিশুদের যাদের প্রতি আস্থা থাকার কথা, তারাই অধিকাংশ অপরাধ ঘটাচ্ছে। অর্ধেকেরও বেশি হত্যাকাণ্ডে পরিচিতরা জড়িত। মা-বাবা সরাসরি জড়িত ১৭টি ঘটনায় এবং আত্মীয়স্বজন জড়িত ১১টিতে (মোট ৩৪.১২ শতাংশ)। এছাড়া প্রতিবেশী ও পরিচিতরা জড়িত ২২টি বা ২৫.৮৮ শতাংশ ঘটনায়।

প্রতিবেশী ১৭. ৯০ শতাংশ (৬০ জন), শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক ১১.৩১ শতাংশ (৩৮ জন), আত্মীয় ৪.৪৬ শতাংশ (১৫ জন), বাবা বা সৎ বাবা ৩.২৭ শতাংশ (১১ জন) এবং অন্যান্য পরিচিতদের হার ৩২.১৪ শতাংশ (১০৮ জন)। অপরাধীদের বয়স ১০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে বিস্তৃত, যার মধ্যে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী অপরাধী সবচেয়ে বেশি (৩০.৪৮ শতাংশ বা ১১৪ জন)।

মিডিয়া মনিটরিং সূত্রে জানা যায়, শিশুহত্যার ৮৬টি ঘটনায় ৪৪টিতে পুলিশ আসামিদের আটক করতে পেরেছে। অন্যদিকে যৌন নির্যাতনের ৩৩৬টি ঘটনার ক্ষেত্রে ২২৯টিতে মামলা হয়েছে এবং ২৬২ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দুটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক রায় দেখা গেছে; ৩ মার্চ ৮ বছরের শিশু মনিকে শ্বাসনালী কেটে হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শেষে গত ৯ জুলাই চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়াও ১৯ মে ঢাকার পল্লবীতে ২য় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনার মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে ৭ জুন ঢাকার ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

শিশু সুরক্ষায় ‘শিশুরাই সব’ জোর দিয়ে জানিয়েছে, অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা ও একটি শিশুসংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। পরিস্থিতি উত্তরণে তারা কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছে।

জাতীয় শিশু কমিশন প্রতিষ্ঠা: তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কাজ করার জন্য অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘জাতীয় শিশু কমিশন’ গঠন করা।

আইনে সংশোধন: ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞায় ছেলে শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের বিচার দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ও মানবসম্পদ বরাদ্দ করা।

পারিবারিক সচেতনতা: শিশুদের ভালো স্পর্শ ও মন্দ স্পর্শের পার্থক্য শেখানো এবং যেকোনো অসম্মতিজনক আচরণে ‘না’ বলার সাহসিকতা তৈরি করা।

পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন: সকল শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিষয়ক বিষয়াবলী পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব: রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী শিশুর সম্মানহানি না করে সংবেদনশীল ছবি ও ভাষা ব্যবহার করা এবং মামলার শেষ পর্যন্ত ফলো-আপ সংবাদ প্রকাশ করা।

এনএইচ