দু’টো বিশ্বযুদ্ধেও নত না হওয়া দেড়শো বছরের প্রাচীন ক্লক টাওয়ারটি শেষ পর্যন্ত বলি হলো সভ্য সমাজের ক্ষোভের আগুনে। লিমোজ শহরের এ দৃশ্যে স্পষ্ট- সীমাহীন অস্থিরতা গ্রাস করেছে ফ্রান্সকে।
মাসব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে বেশ কয়েকবার শিক্ষার্থী আর দাঙ্গা পুলিশ সংঘাতে জড়ালেও শনিবারের সহিংসতা ছিলো নজিরবিহীন। ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও বড় রূপ নেয় যখন জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষ আর পেশাজীবীরাও যোগ দেয় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এদিন শহরে শহরে রাজপথ কাঁপায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ।
বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, ‘তারা আরেকটু কম খরচে উন্নত জীবন চায় এবং আমরাও তাই চাই। এ কারণেই আমরা একত্রিত হচ্ছি এবং ছাত্রছাত্রী, কৃষক ও ভবিষ্যৎ ফ্রান্সে একটি সুন্দর জীবন প্রত্যাশী সকলের সঙ্গে আমরা সবাই এখানে এসেছি।’
রাজধানী প্যারিসে বিকাল পর্যন্ত আন্দোলন শান্তিপূর্ণই ছিল। দিনের শেষভাগে শহরের বিভিন্ন আইকনিক স্থাপনা, সড়ক আর পথচলতি যানবাহনে আগুন লাগিয়ে দেয় কালো পোশাক আর চোখঢাকা চশমা পরিহিত একদল মুখোশধারী। সে সময় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা চালায় পুলিশ; জলকামান দিয়ে গরম পানি আর কাঁদানে গ্যাসও ছোঁড়ে।
মুহূর্তে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ। উত্তাপ ছড়ায় অন্যান্য শহরেও। অরাজক পরিস্থিতি বুঝে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালায় সুযোগসন্ধানীরা। পর্যটনের কার্যালয়, পোশাকআশাক আর খাবারের দোকান তো বাদ পড়েইনি; লিলে শহরে একটি অ্যাপল স্টোরে ঢুকে দোকান খালি করে ফেলে দুর্বৃত্তরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির যাচাইকৃত ফুটেজে দেখা যায়, পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত ট্রেন চালিয়ে পুলিশের ওপর তুলে দেয়ার চেষ্টা করছে মুখোশধারীরা। দেশজুড়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার দুইশোর বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলছে, অভিন্ন স্বার্থে পুরো দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এই বিক্ষোভের মাধ্যমে।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একজন বলেন, ‘এক সময় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ছিলো জ্বালানির দাম নিয়ে; এবার আন্দোলন করছে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নানা দাবি নিয়ে সব শ্রেণিপেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। একটা উদ্দেশ্যে গোটা জাতির এই এক হওয়াই এ আন্দোলনের সৌন্দর্য।’
বিক্ষোভ না হলে তো দাবি সঠিক স্থানে পৌঁছায় না। এখানে উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশাজীবীরা আছেন। পরিবর্তনের শুরু এভাবে ঐক্যের মধ্য দিয়েই হয়।
আরও পড়ুন:
পরিস্থিতি শান্ত করতে শিক্ষার্থীদের সাথে সমঝোতার জন্য ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী তিন হাজার অতিরিক্ত শিক্ষক নেয়ার আশ্বাস দিলেও উত্তাপ কমেনি ফ্রান্সে। দেশটিতে উত্তাল বিক্ষোভ নতুন না হলেও, সাম্প্রতিক সহিংসতা দেশটিকে ঠেলে দিচ্ছে আরও গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে। দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ পূর্ণ করে আগামী বছর বিদায় নেবেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আমার একটিই বার্তা দেয়ার আছে- শান্ত থাকুন। বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান রয়েছে আমাদের। এটি আমাদের গণতন্ত্রেরই একটি সহজাত অংশ যে বিষয়ে আমি সবসময় সতর্ক ও মনোযোগী। কিন্তু এর সঙ্গে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি কর্তব্যও জড়িত। ব্যক্তি ও সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে।’
অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে থাকার মধ্যেই ক্ষমতার শেষ বছরে পা রেখেছেন ম্যাক্রোঁ। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে তার সরকারের ঋণ কমানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় দুই দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের খরচ।
এদিন, একই দাবিতে বিক্ষোভ হয় ইউরোপের আরও অনেক দেশে। ইতালির মিলানে বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘাতে জড়ায় দাঙ্গা পুলিশ। বিলাসবহুল শপিং চত্বর থেকে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের সরতে বাধ্য করে পুলিশ। এ সময় দোকানপাট বন্ধ করে দেয় ব্যবসায়ীরা, ছুটে লুকিয়ে যায় পর্যটকরা। সংঘাতে কয়েকজন আহত ও বেশ ক'জনকে গ্রেপ্তারের পর বন্ধ ছিল মেট্রো স্টেশন।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস আর পূর্বের লিজ শহরে মুখোশধারী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী শ্লোগানে মুখর কয়েকশো বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে শক্তি প্রয়োগ করে পুলিশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর আবাসন সংকটে ক্ষুব্ধ হাজারো মানুষ মধ্য-বামপন্থি সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে বিক্ষোভ করে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। সরকারি দুর্নীতি, বেকারত্ব আর শিক্ষার নিম্নমানের বিরুদ্ধে জনসমাবেশ সহিংস রূপ নেয় আলবেনিয়াতেও।





