সৌদি আরবের সামরিক শক্তি
২০২৫ সালে সৌদি আরব জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে প্রতিরক্ষা খাতে। বিশ্বে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে দেশটির অবস্থান অষ্টম। দেশটি সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। তবে নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন সীমিত হওয়ায় আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনতে হয় রিয়াদকে। সৌদি অস্ত্রাগারে রয়েছে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ইউরোফাইটার টাইফুন, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মতো সরঞ্জাম। এসব যুদ্ধবিমান দিয়েই গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনে হুথি অবস্থানগুলোতে হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। এখন তাদের অস্ত্র ইসরাইলের মতো ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। অত্যাধুনিক অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে প্যালেস্টাইন-২ নামের হাইপারসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন দুই স্তরের কঠিন জ্বালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এছাড়া ইরানের গদর ক্ষেপণাস্ত্রের রূপান্তরিত সংস্করণ তুফান এবং বুরকান ও বদর সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে হুথিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিন্ন ভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ছুড়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে হুথিরা। ইয়েমেনের ২ হাজার কিলোমিটার দূরে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করেও হামলা চালিয়েছে তারা, যা তাদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ।
সৌদি প্রতিরক্ষা কেন ব্যর্থ
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা কিছু হামলা প্রতিহত করলেও বিশাল ভূখণ্ডের কারণে সব সময় সব দিক সুরক্ষিত রাখা তাদের পক্ষে অসম্ভব। সৌদি আরবের আয়তন প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার। শুধু কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আয়তনই ২২৫ বর্গকিলোমিটার, যা রাজধানী রিয়াদের কেন্দ্র থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে।
লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মিনা অ্যানালিটিকার আন্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, প্যাট্রিয়ট, থাড, যুদ্ধবিমান ও সেন্সর মিলিয়ে যে বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই থাকুক না কেন, সৌদি আরবের মতো বিশাল দেশের ওপর অবিচ্ছেদ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করা সম্ভব নয়। রাজধানী, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও পবিত্র শহরগুলোকে একসঙ্গে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুতও দ্রুত কমছে, যার ঘাটতি বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে।
হুথিরা কেন হামলা বাড়াচ্ছে
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, সব হামলাই প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করতে না পারলেও হুথিদের লক্ষ্য অর্জনে সমস্যা নেই। মাঝে মধ্যে একটি হামলা সফল হলেই তারা কৌশলগত বার্তা দিতে পারে। টানা হামলার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করছে, তারা দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
থমাস জুনো বলেন, হুথিরা আসলে ‘খেলার নিয়ম নতুন করে লিখতে চায়’। সৌদি জোট সানায় হামলা চালাচ্ছে, পাল্টা তারা সৌদির বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা সৌদি আরবের জন্য এই অবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়, কারণ প্রতিটি হামলার পর যুদ্ধ বন্ধ করার খরচ আরও বাড়ছে।
রিয়াদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ কী
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দরটি মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পিত ‘ভিশন ২০৩০’ কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। এই পরিকল্পনায় রিয়াদকে পর্যটন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। বিমানবন্দরে বারবার হামলা সামরিক ক্ষতির চেয়ে অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি ক্ষতি করছে। শনিবারের হামলাটি এর আগে যে সময়ে হয়েছে, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। এর পরই রিয়াদে শুরু হচ্ছে জ্বালানি-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেসসহ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক নানা গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা মোবাইল টেক্সট মেসেজে দিলেও সম্প্রতি তা বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।





