ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা; তিন শিশুসহ নিহত অন্তত ১৫

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যারেজের পাশে এক বাসিন্দা ও তার কুকুর
রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যারেজের পাশে এক বাসিন্দা ও তার কুকুর | ছবি: রয়টার্স
0

ইউক্রেনজুড়ে আজ (বুধবার, ৭ অক্টোবর ) ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে তিন শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। হামলায় বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কর্মকর্তারা জানান, উত্তরাঞ্চলীয় প্রিলুকি শহরের একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে তিন শিশুসহ অন্তত নয়জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৪০ জন। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটির কয়েকটি অংশ ধসে পড়লে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা মই ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে হতাহতদের উদ্ধারে তৎপরতা চালান।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, রাজধানী কিয়েভ, ওলেকসান্দ্রিয়া এবং ক্রেমেনচুকে রাতের হামলায় আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি ছিল অন্যতম নিকৃষ্ট হামলা। মোট ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো ব্যালিস্টিক। অন্যতম প্রধান নিশানা ছিল আমাদের জ্বালানি অবকাঠামো। রুশরা বড় ধরনের ক্ষতি করতে চেয়েছিল।’

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক-শিল্প স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের বিভিন্ন কারখানা ও ডিপো। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ফ্লেমিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি ও দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি ও মজুত করে। কিয়েভ, চেরনিহিভ, কিরোভোহরাদ, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা এবং খারকিভ অঞ্চলে এসব স্থাপনা অবস্থিত।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া ৪৬টি জেটচালিত ড্রোনের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ড্রোন ভূপাতিত করার তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। গত গ্রীষ্মকাল থেকে কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে তীব্র গতির এসব ড্রোন দিয়ে হামলা বাড়িয়েছে মস্কো, যা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বেগ পেতে হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনো ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় তারা মার্কিন নির্মিত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তীব্র গতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইউক্রেনের হাতে প্যাট্রিয়টই একমাত্র ভরসা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ইউক্রেন সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এদিকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ইউক্রেনের পাঁচটি অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

জেলেনস্কি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনীয় বাহিনীও রাশিয়ার অভ্যন্তরে পার্ম, সামারা এবং আস্ট্রাখান অঞ্চলের দুটি তেল শোধনাগার ও একটি প্রশিক্ষণ শিবিরসহ চারটি স্থানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে বেসামরিক অবকাঠামোয় মস্কোর হামলার জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি খাতে আঘাত হানবে। এছাড়া ফায়ার পয়েন্টের তৈরি দীর্ঘপাল্লার এফপি-৯ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত প্রস্তুত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি, যা মস্কো পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।

হামলার সাইরেন ও সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কিয়েভের অনেক বাসিন্দা রাতভর গভীর ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নেন। রাতে রাজধানীতে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। লেসিয়া নামের কিয়েভের ৪৯ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেন, ‘মেট্রো স্টেশন তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ আমরা বহুতল ভবনের নয়তলায় থাকি। মাথার ওপর দিয়ে যখন ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায়, তখন নয়তলায় থাকা সত্যিই অত্যন্ত ভীতিকর।’

এছাড়া রাতের হামলায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোর একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাপোরিজিয়ার পরিবহন অবকাঠামো এবং ক্রেমেনচুকের আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এএম