১২ মিনিটের আতঙ্ক: যেভাবে পাইলট-যাত্রীদের চেষ্টায় রক্ষা পেলো ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজ

দ্য ফ্লাইদুবাই প্লেইন
দ্য ফ্লাইদুবাই প্লেইন | ছবি: সংগৃহীত
0

ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ আকাশে থাকা অবস্থায় ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ে। সহকারী পাইলট উড়োজাহাজটির ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর উড়োজাহাজটি মাত্র দুই মিনিটে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।

পাইলট আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। এরপর কয়েকজন যাত্রী ককপিটে ঢুকে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন। যাত্রীদের একজন কিছু সময়ের জন্য উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণও নেন। পরে আরেক পাইলট এসে নিয়ন্ত্রণ নেন। শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল এবং কীভাবে উড়োজাহাজটি রক্ষা পেল?

উড়োজাহাজটি কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিল?

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ৩টা ৫ মিনিট) দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করে। ফ্লাইটটি ৩৪ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় উঠেছিল। দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর উড়োজাহাজটি হঠাৎ নিচে নামতে শুরু করে। এরপর সেটি আবার ওপরে ওঠে এবং দ্বিতীয়বার দ্রুত নিচে নামতে থাকে।

০৫:২১ জিএমটি: শুরু হয় দ্রুত অবতরণ

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রথমে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। এরপর হঠাৎ ওপরে ওঠে এবং আবার তীব্র গতিতে নিচে নামতে থাকে। যাত্রী আদম পোলো সিএনএনকে বলেন, প্রথমে তার মনে হয়েছিল উড়োজাহাজটি স্বাভাবিক কোনো ‘এয়ার পকেটে’ পড়েছে। কিন্তু এক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। উড়োজাহাজের বিদ্যুৎ, মাল্টিমিডিয়া ব্যবস্থা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। যারা আসনে বসে ছিলেন না, তারা পড়ে যান। যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র দুই মিনিটে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়।

ককপিটে তখন কী হচ্ছিল?

উড়োজাহাজটি নিচে নামার সময় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে লড়াই চলছিল। সহকারী পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত হয়ে মাচ্ছার ককপিটের মেঝেতে পড়ে যান। তিনি পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভিডিও কলে বলেন, উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নামছে বুঝতে পেরে তিনি শেষবারের মতো ককপিটের দরজা খোলার চেষ্টা করেন। বিমান চলাচলের সময় ককপিটের দরজা সাধারণত বন্ধ থাকে এবং পাইলটরাই সেটি খুলতে পারেন। আহত অবস্থায় মাচ্ছার দরজার রিলিজ খুলতে সক্ষম হন।

যাত্রীরা ককপিটে ঢুকলেন কীভাবে?

ককপিটের দরজা খোলার পর কয়েকজন যাত্রী দ্রুত সেখানে ঢুকে পড়েন। যাত্রী আসাফ রাজুয়ান জানান, ককপিট থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন তারা। উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নামছিল। যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুনও ককপিটে ঢোকেন। পরে তিনি জানান, তিনি সেখানে আহত পাইলটকে মেঝেতে পড়ে থাকতে এবং সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সামনে দেখতে পান। হায়ুন সহকারী পাইলটকে ধরে ককপিটের বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর কয়েকজন যাত্রী মিলে তাকে আটকে রাখেন। তাকে বাঁধতে তারযুক্ত হেডফোনও ব্যবহার করা হয়।

একজন যাত্রী কি উড়োজাহাজ চালিয়েছিলেন?

কিছু সময়ের জন্য হ্যাঁ। সহকারী পাইলটকে ককপিট থেকে বের করে আনার পর হায়ুন আবার ককপিটে ঢোকেন। তিনি উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন এবং সেটিকে ওপরে তোলার চেষ্টা করেন। হায়ুন বলেন, তিনি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ওপর নির্মিত টেলিভিশন সিরিজ ‘মেডে’ দেখেন। এর কিছুক্ষণ পর উড়োজাহাজে থাকা আরেকজন পাইলট ককপিটে পৌঁছান। তখন হায়ুন তার কাছে নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দেন।

ট্রাম্পের বর্ণনায় ‘ইসরাইলি প্লাম্বার’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিতে যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুনের ভূমিকার প্রশংসা করেন। ট্রাম্প তাকে ‘ইসরাইলি প্লাম্বার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হায়ুন দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে ককপিটে গিয়ে সহকারী পাইলটকে আসন থেকে সরিয়ে দেন এবং কিছু সময়ের জন্য উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে হায়ুন নিজে কীভাবে উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, সে বিষয়ে তার নিজের বক্তব্যও রয়েছে।

ক্যাপ্টেনকে চিকিৎসা দেন একজন দন্ত চিকিৎসক

ককপিটে ঢোকার পর যাত্রীরা শুধু সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেননি, আহত ক্যাপ্টেনকেও চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেন। উড়োজাহাজে থাকা শোতা মুসায়েভ একজন দন্ত চিকিৎসক। চিৎকার শুনে তিনি ককপিটে ছুটে যান। তিনি জানান, ক্যাপ্টেনের মাথা থেকে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল। মুসায়েভ বলেন, তিনি রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন এবং ক্যাপ্টেনের রক্তচাপ স্থিতিশীল করেন। তার ধারণা, জরুরি চিকিৎসা ক্যাপ্টেনের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছে।

০৫:২৮ জিএমটি: জরুরি সংকেত

উড়োজাহাজটি সৌদি আরব ও জর্ডানের সীমান্তের কাছে থাকা অবস্থায় ট্রান্সপন্ডার কোড ৭৭০০ প্রচার করতে শুরু করে। এটি সাধারণ জরুরি অবস্থার আন্তর্জাতিক সংকেত। এরপর উড়োজাহাজটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় স্থিতিশীল হয়।

০৫:৩৫ জিএমটি: অবৈধ হস্তক্ষেপের সংকেত

দুই মিনিট পর উড়োজাহাজটির ট্রান্সপন্ডার কোড পরিবর্তন হয়ে ৭৫০০ হয়। ৭৫০০ কোড উড়োজাহাজে অবৈধ হস্তক্ষেপের সংকেত দেয়। এরপর উড়োজাহাজটি পশ্চিম দিকে ঘুরে কিছু সময় জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। পরে আবার সৌদি আরবের দিকে ফিরে যায়।

০৫:৪৪ জিএমটি: জরুরি অবতরণের আবেদন

সৌদি আরবের তাবুকের বিমান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ থেকে জরুরি অবতরণের আবেদন জানানো হয়। উড়োজাহাজটি তাবুকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আবার ট্রান্সপন্ডার কোড ৭৭০০ চালু করা হয়।

০৬:৫৮ জিএমটি: তাবুকে অবতরণ

উড্ডয়নের প্রায় চার ঘণ্টা পর উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ করে। সেখানে জরুরি চিকিৎসাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা অপেক্ষা করছিলেন। উড়োজাহাজে থাকা ১৭৪ জনের মধ্যে ছিলেন আহত ক্যাপ্টেন, হামলাকারী সহকারী পাইলট এবং সেই যাত্রীও, যিনি কিছু সময়ের জন্য উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন।

ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার এখন কেমন আছেন?

প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় সৌদি আরবের তাবুকে। পরে তাকে বিমানযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নেয়া হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তিনি ভালো আছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন। ভারতীয় দূতাবাসের রিয়াদ শাখা জানিয়েছিল, প্রথমে তাকে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুকের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়।

কেন ঘটনাটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই ঘটনায় কয়েক মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যায়। একই সময়ে ককপিটে পাইলটদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন। একজন যাত্রী কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন এবং পরে আরেক পাইলট এসে দায়িত্ব নেন। এরপর উড়োজাহাজটি জরুরি সংকেত পাঠিয়ে সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ করে। ঘটনাটির তদন্ত চলছে। হামলার উদ্দেশ্য এবং সহকারী পাইলটের কর্মকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।

—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম