গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় মুজতবার পিতা আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় মুজতবার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো। এরপর থেকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়নি। ইরানি জনগণের কাছে তার কয়েকটি লিখিত বিবৃতি পাঠানো হয়েছে, যা সংবাদ উপস্থাপকরা পড়ে শুনিয়েছেন। এমনকি গত মাসে তার বাবার জানাজায় সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ‘প্রশ্নটা এখন আর মুজতবা বেঁচে আছেন কি না তা নিয়ে নয়, বরং ইরানে কার্যকর কোনো সর্বোচ্চ নেতা আদৌ আছেন কি না সেটাই বড় প্রশ্ন।’
ইরানি কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো বলছেন, নিরাপত্তার কারণে মুজতবা আড়াল থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ব্যাপক ক্ষমতা শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত করেছেন। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, মার্কিন হামলা থেকে রক্ষার জন্য মুজতবার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন।
তবে মুজতবার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে এবং তিনি মনোযোগী ও সক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন।প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত ১০ আগস্ট জানান, তিনি মুজতবার সঙ্গে সাত ঘণ্টার বৈঠক করেছেন।
কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকদের মধ্যেও সংশয় ঢুকে পড়েছে। ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের কেন্দ্র কোম শহরের বাসিজি মিলিশিয়ার এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের নেতার কণ্ঠস্বর শুনতে হবে, অথবা এমন কোনো চিহ্ন দেখতে হবে যা আমাদের আস্থা জোগাবে যে তিনি দেশ পরিচালনা করছেন।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বাসিজি সদস্য বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন মুজতবা এখনো মূল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; কিন্তু একটি ছবিও না থাকা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী।
যারা সংস্কারপন্থী বা শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী, তারা আরও সরাসরি কথা বলছেন। তেহরানের এক সংস্কারপন্থী ব্যবসায়ী শাহরোখ, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, ‘আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব যে মুজতবাকে হত্যা করা হয়নি? তিনি বেঁচে আছেন এটা প্রমাণ করার মতো একটি চিহ্নও নেই, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের কথা তো দূরে থাক।’
রেভল্যুশনারি গার্ডসই কেন্দ্রে
ছয় মাস যুদ্ধ করেও ইরান বিধ্বস্ত হলেও টিকে আছে। রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ। সেনাবাহিনী পারস্য উপসাগরের মিত্রদেশগুলোতে হামলা করার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এখনো ধরে রেখেছে।
তবে যুদ্ধের খরচ ও তেল রপ্তানিতে কয়েক মাস ধরে চলা অবরোধে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। ইরানি রিয়ালের দরপতন হচ্ছে। জানুয়ারিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে যে গণআন্দোলন দমন করা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন কর্তৃপক্ষ।
এ পরিস্থিতিতে শাসকগোষ্ঠী পুনর্গঠিত হয়েছে স্পষ্ট একটি লক্ষ্য নিয়ে—রাষ্ট্র রক্ষা করা, প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্রগুলো জানায়, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে পুনর্বিন্যস্ত শাসনকাঠামোয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) যুদ্ধ শুরু থেকেই ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। শীর্ষ কাউন্সিলে রয়েছেন আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডাররা, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সব চাপ সত্ত্বেও জনসেবা থামেনি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি একীভূত, সিদ্ধান্তগুলো সংগতিপূর্ণ। এটাই প্রমাণ করে সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্বে আছেন।’
তবে গবেষক ভাতানকা বলছেন, এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি বিপজ্জনক। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো প্রকৃত চুক্তির জন্য মুজতবার স্পষ্ট অনুমোদন দরকার। একইভাবে দরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্যও।’ তিনি আরও বলেন, ‘তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো প্রত্যেকেই দাবি করতে পারছে যে তারাই জানে নেতা আসলে কী চান।’





