স্বাধীনতা দিবসের আগে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের’ আহ্বান জানান। ভবিষ্যৎ ভারত গড়তে ‘নির্লোভ, নির্ভীক ও চরিত্রবান’ নারী-পুরুষদের খুঁজে বের করার জন্য নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন তিনি।
ওয়াংচুক জানান, সম্প্রতি তিনি অসুস্থ ছিলেন। এই সময়ে ভারতের গতিপথ নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেছেন। এশিয়ার বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেশের অগ্রগতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বর্তমান গতিপথ চলতে থাকলে ভারত তার উন্নয়ন লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘আমরা যদি মাথাপিছু জিডিপির কথা বলি এবং এটি যদি এমনই চলতে থাকে, তবে ২০৪৭ সালে আমরা কোনো উন্নত দেশ তো হবই না, বিশ্ববাজারে মুখ দেখাতেও পারব না।’
ভারতের ভবিষ্যতকে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন এই সমাজকর্মী। তিনি বলেন, শিক্ষার অগ্রগতিকে ছাপিয়ে জাতীয় অগ্রগতি অর্জন সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, ‘যতদিন শিক্ষা পিছিয়ে থাকবে, ততদিন দেশের ভবিষ্যৎও পিছিয়ে থাকবে।’
গত কয়েক মাসের বিভিন্ন প্রতিবাদের মাধ্যমে পরিবর্তনের দাবি তোলা ব্যক্তিদের ওয়াংচুক অভিনন্দন জানান এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতর ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্বের অধীনে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করার মতো কোনো কারণ তিনি এখনো দেখতে পাচ্ছেন না।
‘দলের নয়, ব্যবস্থার প্রশ্ন’
সুশাসনের বৃহত্তর প্রশ্ন সম্পর্কে ওয়াংচুক বলেন, এই সমস্যাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। তার মতে, বিভিন্ন দলের সরকার মাঝে মাঝে ভিন্নমতের প্রতিক্রিয়া একই রকমভাবে জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সুতরাং এটি এমনকি দলের বিষয়ও নয়। আমার উদ্বেগের মূলে রয়েছে ভারতকে কীভাবে শাসন করা হচ্ছে সেই বৃহত্তর প্রশ্ন।’
তিনি ২০১২-১৩ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন। ওই আন্দোলনের ফলে সরকার বদল হলেও দুর্নীতি ও অবিচার এখনো দূর হয়নি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘তবে আজ, ১২ বছর পর, দুর্নীতি ও অবিচার একটি নতুন রূপ ধারণ করেছে।’ এই সমস্যাকে তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ও আরও উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেন।
ওয়াংচুকের দৃষ্টিতে মূল দুর্বলতা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দেশে খুব বড় একটি পরিবর্তন দরকার, বিপ্লব দরকার, শান্তিপূর্ণ বিপ্লব দরকার। যাতে আমরা সঠিক নেতাদের নিয়ে এগোতে পারি। কারণ সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের নেতৃত্ব বেছে নেয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত না নেতারা সঠিক হন, ততক্ষণ পুরো দেশটাই ভুল পথে চলবে।’
তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার এই সমালোচনা কোনো নির্দিষ্ট দল বা বিরোধী পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা বিরোধী দলের কথা বলছি না, আমি দেশের কথা বলছি।’
দেশজুড়ে সংলাপের আহ্বান
ওয়াংচুক এই উদ্বেগকে এখন জাতীয় পর্যায়ে একটি বৃহত্তর কথোপকথনে পরিণত করতে চাইছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভারতজুড়ে মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করতে এবং ‘সেরা মানুষদের’ একত্রিত করে কী পরিবর্তন প্রয়োজন সে বিষয়ে ভাবনার আয়োজন করতে চান।
তবে তার এই আহ্বান শুধু শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশেষভাবে খুঁজছেন এমন মানুষদের, যাদের তিনি ‘নির্লোভ, নির্ভীক ও চরিত্রবান নারী-পুরুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রতিটি অঞ্চল থেকে এমন অন্তত একজনের নাম প্রস্তাব করার জন্য নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন তিনি। ওয়াংচুকের ভাষায়, ‘প্রত্যন্ত লাদাখে বসে আমি জানি না তারা কারা এবং কোথায়। তাই আপনি দেশ ও আপনার অঞ্চল থেকে এমন অন্তত একটি নাম প্রস্তাব করে সহায়তা করতে পারেন।’
তিনি বলেন, তিনি বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে সফর করতে চান, পরামর্শ সংগ্রহ করতে চান এবং সেসব মানুষের সঙ্গে দেখা করতে চান যারা ‘আমাদের দেশের একটি নতুন মানচিত্র’ তৈরিতে সাহায্য করতে পারেন। ওয়াংচুকের কাছে এটি একটি রূপক নকশা, যার মাধ্যমে ভারতের প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ফুটে উঠবে। ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু’ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি নাগরিকদের এই বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। শিক্ষা ও সুশাসন সংক্রান্ত নির্দিষ্ট উদ্বেগ থেকে সরে এসে রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বৃহত্তর দাবি তোলার মাধ্যমে ওয়াংচুকের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য প্রচারণা আরও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে।





