ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ ঘাঁটিতে আঘাত হানতে কিয়েভ একটি ‘অনন্য অভিযানে’ রকেট, জেট ও নৌ-ড্রোন ব্যবহার করেছে। যদিও শস্য টার্মিনালে আঘাত হানার বিষয়ে তিনি কিছু উল্লেখ করেননি। পরে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার দুটি ফ্রিগেটসহ চারটি যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। রাশিয়া অবশ্য এই বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘যতদিন রুশ আগ্রাসন চলবে, ততদিন দখলদার নৌবহর ও এর সহায়ক অবকাঠামোগুলো কোনোভাবেই নিরাপদ থাকবে না।’
রুশ-অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপল ঘাঁটি ইউক্রেনের হামলার ঝুঁকিতে পড়ায় সেটি খালি করতে বাধ্য হওয়ার পর থেকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর বহরের বেশির ভাগ যুদ্ধজাহাজ এখন নভোরসিয়স্ক বন্দরে অবস্থান করছে। এটি রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বন্দরও বটে। কিছুদিনের আপেক্ষিক শান্তির পর এই গ্রীষ্মে কৃষ্ণসাগরে হামলা-পাল্টা হামলা বেড়েছে।
শস্য টার্মিনালে ক্ষতি
একটি বড় শস্য বাণিজ্য কোম্পানি রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাসের কাছে বুধবারের হামলায় তাদের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়টার্স ও রুশ সংবাদমাধ্যম আরবিকের কাছেও একই কথা বলেছে। রাশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, তারা পণ্যবাহী কার্গোর প্রবাহ বাল্টিক ও ক্যাস্পিয়ান সাগর বন্দর এবং স্থলপথে ঘুরিয়ে দেয়ার কাজ করছে। ইউক্রেনের হামলার কথা উল্লেখ না করলেও ‘বর্তমান পরিবহন সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই’ এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশযানগুলো ভূপাতিত করার সময় রাতভর নভোরসিয়স্কে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বন্দরের আশপাশের এলাকায় ড্রোন হামলায় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শহরের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুধবার নভোরসিয়স্কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। আশপাশের এলাকায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর ভেনিয়ামিন কনদ্রাতিয়েভ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রাসনোদার অঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে ‘কয়েকশ ড্রোন’ হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে বাড়িঘরসহ কয়েক ডজন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাল্টা হামলা রাশিয়ার
এদিকে মঙ্গলবার থেকে বুধবারের মধ্যে ইউক্রেনে চালানো রাশিয়ার আকাশপথে রাতভর হামলায় অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এদের বেশির ভাগই মারা গেছেন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায়। শহরটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্লাইড বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনের যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের এক-দশমাংশ প্রয়োজন। এই মজুতের ৫ শতাংশ পেলেই শীতকাল পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চেয়ে এ বছর ইউক্রেনের কাছে আড়াই গুণ কম ইন্টারসেপ্টর রয়েছে, অথচ ‘রাশিয়ার হাতে আগের চেয়ে প্রতি মাসে দ্বিগুণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।’
খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব
২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করেন। ইউক্রেনের সমুদ্রপথে বেঁচে থাকা সর্বশেষ রপ্তানির পথটি রুশ হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মস্কো ওদেসা বন্দরে ও কার্গো জাহাজে বারবার প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ইউক্রেনের সঙ্গে বাণিজ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। ইউক্রেনিয়ান এগ্রিবিজনেস ক্লাব (ইউক্যাব) জুলাই মাসে জানিয়েছিল, এতে দেশটির রপ্তানি ২৩ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভূখণ্ডে দূরপাল্লার হামলায় দক্ষ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি পূর্ব কৃষ্ণসাগরে জাহাজে চালানো হামলা রাশিয়ার শস্য চালানও ব্যাহত করেছে। রাশিয়া হলো বিশ্বের বৃহত্তম গম রপ্তানিকারক দেশ। তবে মস্কোভিত্তিক একটি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, কৃষ্ণ ও আজভ সাগরে অস্থিতিশীলতার কারণে গত পাঁচ বছরের একই মাসের তুলনায় চলতি আগস্টে রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমতে পারে।
বুধবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা রুশ শস্য ও কৃষি অবকাঠামোয় হামলা চালানোর জন্য ইউক্রেনকে অভিযুক্ত করেন। তার দাবি, এর ফলে বিশ্ব খাদ্য মূল্য বাড়ছে এবং শস্যের ঘাটতি বাড়ছে। তবে জাখারোভা এটিও বলেছেন, ‘আজভ সাগর ও কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত’ কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল অস্থিতিশীল করতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যেসব স্থাপনা ব্যবহার করছে, সেগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখবে রাশিয়া।
২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব খাদ্য সরবরাহকে কতটা প্রভাবিত করবে সেই উদ্বেগ ছিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন একসঙ্গে বিশ্বের শস্য বাণিজ্যের বড় একটি অংশ সরবরাহ করে থাকে, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলের ক্রেতাদের জন্য। ২০২২ সালের ‘কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগের’ আওতায় রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষি রপ্তানির ওপর দেয়া অবরোধ প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছিল। তবে পরের বছর মস্কো ওদেসাগামী সামুদ্রিক করিডোরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা পুনরায় শুরু করলে সেই উদ্যোগ টেকেনি।





