মঙ্গলবার বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই কাঠমান্ডুর মৈতিঘর মণ্ডলা স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে নামে শোকের আবহ। কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে তুষারধসে প্রাণ হারানো আরোহী নির্মল পুরজা ও অভিযাত্রীদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন স্থানীয় নেপালিরা।
গেল বুধবার নেপালি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ পর্বতারোহী নির্মল পুরজার নেতৃত্বে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকের চূড়ায় ওঠার জন্য যাত্রা করেন ৫ নেপালি ও চার বিদেশি পর্বতারোহী। পরদিন তুষারধসের পর অভিযাত্রী দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শেষপর্যন্ত পুরজাসহ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কিন্তু এই মৃত্যুকে এত সহজে মেনে নিতে পারছেন না এডভেঞ্চার প্রেমীরা। নির্মল পুরজাসহ ঐ নেপালি আরোহীরা ছিলেন অত্যন্ত চৌকশ অভিযাত্রী। ডজনখানেক বার মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ, অক্সিজেন ছাড়াই ৮শ মিটার উঁচু শৃঙ্গ জয়, সবচেয়ে প্রাণঘাতী কে-টু পর্বত- তাদের কৃতিত্ব আর সাহসিকতার লিস্ট অনেক দীর্ঘ।
আর সবচেয়ে মর্মান্তিক পদকপ্রাপ্ত ব্রিটিশ-নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজার প্রয়ান। ৬ মাসের কিছু বেশ সময়ে বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছিলেন এই পুরজা। নিমস নামেই বেশি পরিচিত নির্মল পুরজা ছিলেন এই প্রজন্মের সেরা পর্বত আরোহীদের একজন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ মাউন্টেন গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের সনদপ্রাপ্ত মাত্র ১০০ জন নেপালি গাইডের মধ্যেও নাম ছিল পুরজার।
বাকি ৫ নেপালি আরোহীর মধ্যে গ্যালজেন শেরপা এক মৌসুমে তিনবার তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্গা আরোহণ করে হয়েছিলেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের দাবিদার। ২০২৬ সালেই চারটি আট-হাজারী পর্বত আরোহণ করে খ্যাতি অর্জন করেন দলের আরেক অভিযাত্রী নিমা শেরপা। সহজ কথায়, সেরাদের সেরা হয়েও পুরজাসহ ৬ নেপালি আরোহীর এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না অভিযানপ্রেমীরা।
এই মৃত্যুর পেছনে আছে রহস্যে ভরা বিপদসংকুল কারাকোরাম পর্বতমালা। জুন থেকে সেপ্টেম্বর- বর্ষা মৌসুমে নেপালের বদলে পাকিস্তানের সুদূর উত্তরে পাঁচটি আট-হাজারী শৃঙ্গ জয় করার নেশা হাতছানি দেয় আরোহীদের। আগ্রহের কেন্দ্রে অঞ্চলটির নির্জনতা আর ঝুঁকি। যেখানে প্রতিবছর দশ লক্ষেরও বেশি পর্যটক হিমালয়ে যান, সেখানে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় বছরে অভিযান করেন ১৫ হাজারের মতো অভিযাত্রী।
দেখা গেছে, নেপালে পর্বতারোহণের পরিকাঠামো বেশ উন্নত। এভারেস্টের দিকে যাওয়ার প্রধান ট্রেকিং রুটগুলোর দু'পাশে লজ আছে। আছে জীবনধারণের অন্যান্য সুবিধাও। সেখানে নিখোঁজদের উদ্ধারকাজও সহজতর। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ও সীমান্ত চৌকির মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক আছে সেখানে। বিপরীতে, কারাকোরাম পর্বতমালা একেবারে বিচ্ছিন্ন একালায় হওয়ায় সহজে অবতরণযোগ্য স্থানের সংখ্যা কম।
সাবেক গাইডদের অনেকেই বলছেন, এই ঝুঁকি আর প্রাণ যাওয়ার ভয়কেই অনেকে অভিযাত্রার মূল চালিকা শক্তি মনে করেন। কারাকোরামের গিয়ে প্রাণ হারানো আরোহীদের ইতিহাস কখনোই ভুলবে না, বরং তাদের অভিযানের গল্প আরও অনেকে গাইডকে অনুপ্রাণিত করবে।





