সেউতা সংকট নিয়ে ইইউর জরুরি বৈঠক, ২২ দেশের যৌথ চিঠি

স্পেনীয় সেনাদের পাহারায় অভিবাসীরা
স্পেনীয় সেনাদের পাহারায় অভিবাসীরা | ছবি: আল জাজিরা
0

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসীর ঢল নামার পর জরুরি বৈঠক ডেকেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এই ঘটনায় ইউরোপে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সেউতার আশপাশের জলসীমায় স্পেনের কোস্টগার্ড টহল দিচ্ছে। রোববার দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়া অধিকাংশ অভিবাসীকেই এরই মধ্যে প্রতিবেশী মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ-অভিবাসনের এই ঘটনায় অন্তত ৭২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

সেউতায় আসলে কী ঘটেছিল, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে। সেউতার জনসংখ্যা মাত্র ৮৪ হাজার। কিন্তু বুধবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে সেখানে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী ঢুকে পড়েন বলে জানিয়েছেন সেউতার শীর্ষ কর্মকর্তা হুয়ান জেসাস ভিভাস। যদিও স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সংখ্যা ৫০ হাজার বলে জানিয়েছে।

অনেকে মরক্কো থেকে ওয়েটস্যুট ও রাবারের নৌকা ব্যবহার করে সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান এবং সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ঢুকে পড়েন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে; এ কারণে জরুরি সাড়া দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এক মরক্কীয় অভিবাসী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি কাস্তেলিহোসের বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে মরক্কো পুলিশের একটি দেয়াল টপকাই। এরপর সাঁতরে সীমান্ত পেরিয়েছি। সাগরে প্রায় ২০০ মিটার সাঁতার কেটেছি, এটুকুই।’

তবে শনিবারের মধ্যে ‘প্রায় সবাই’ ফিরে যাওয়ায় ভূখণ্ডটির পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা। এবারের অভিবাসী ঢলের মাত্রা ২০২১ সালের মে মাসের ঘটনার চেয়েও অনেক বড়। সেবার দুই দিনে মরক্কো থেকে প্রায় ১২ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন।

সেউতা ১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের উপনিবেশ। মেলিলার পাশাপাশি এটি আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় অধীনস্থ দুটি ভূখণ্ডের একটি। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশী ও অভিবাসীদের জন্য এই ছিটমহল স্পেন ও ইইউতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। এটির চারপাশে রয়েছে উঁচু সীমান্ত বেড়া, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্পেনের সিভিল গার্ড ও ন্যাশনাল পুলিশের স্থায়ী পাহারা।

ইইউর ঘূর্ণায়মান দায়িত্বে থাকা আয়ারল্যান্ড জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার এই সংকট নিয়ে আলোচনা করতে ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি জরুরি ভিডিও কনফারেন্স ডাকা হয়েছে। ২৭ সদস্যের ইইউর ২২টি সদস্য দেশ ‘সমন্বিত পদক্ষেপ এবং বহিরাগত সীমান্ত জোরদারের’ আহ্বান জানিয়ে যৌথ চিঠি দেয়ার পর এই বৈঠক ডাকা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা অনিয়ন্ত্রিত গণ-অনুপ্রবেশ, অভিবাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার অথবা অন্যান্য হাইব্রিড হুমকিকে এমন ধারণা তৈরি করতে দিতে পারি না যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবৈধভাবে প্রবেশ সম্ভব; এবং তা করলে বৈধ থাকার সুযোগ পাওয়া যাবে।’

এদিকে ইতালি স্পেনের সঙ্গে তাদের অবাধ যাতায়াতের শেনজেন চুক্তি স্থগিত করেছে। মাদ্রিদ এর কড়া নিন্দা জানিয়েছে। এই দুই দেশের অভিন্ন সীমান্ত না থাকায় ইতালির এই সিদ্ধান্তের কার্যকরী প্রভাব কতটা হবে, তা অস্পষ্ট। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য স্পেনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। তবে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্তে পুলিশের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। পর্তুগালও তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় স্থল ও সমুদ্রসীমায় নজরদারি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে।

ইউরোপের একজন শীর্ষ রক্ষণশীল রাজনীতিক ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার ক্ষমতা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির নেতা ম্যানফ্রেড ভেবার শনিবার বলেন, ‘আমাদের ইউরোপীয় বহিরাগত সীমান্ত সংস্থা বা সীমান্ত সুরক্ষাকারী ফ্রনটেক্সের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা তুলে দেয়া উচিত। যদি স্পেনের বামপন্থি সরকার বহিরাগত সীমান্ত সুরক্ষা করতে না চায়, তবে ফ্রনটেক্সকেই কমান্ডের কর্তৃত্ব দিতে হবে। ইউরোপকেই ওই সীমান্তে গিয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে।’ স্পেনের বর্তমান সরকার সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বে।

কেন হঠাৎ এই অভিবাসী ঢল—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে গত ৮ জুলাই স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়। ওই রায়ে বলা হয়েছে, সাগরে আটক অভিবাসীদের সংক্ষেপে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে যারা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।

উত্তর আফ্রিকার অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগ্নাসিও সেমব্রেরো বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ৮ জুলাইয়ের রায় এখানে ভূমিকা রেখেছে। তবে এটি এত বড় গণ-অনুপ্রবেশের ব্যাখ্যা দেয় না।’ কিছু বিশেষজ্ঞ এই তত্ত্বের বিরোধিতা করে বলছেন, বেশির ভাগ অভিবাসীই আদালতের ওই রায় সম্পর্কে জানতেন না। তাদের মতে, স্পেন সরকারের তুলনামূলকভাবে উদার অভিবাসন নীতিও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রান্দে-মার্লাস্কা এ ঘটনার জন্য মানব পাচারকারী চক্রগুলোকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, তারা দুর্বল অভিবাসীদের ব্যবহার করছে এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ছড়াচ্ছে। সেউতায় সাংবাদিকদের তিনি জানান, স্পেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। তবে সংকট আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো শেষ হয়নি বলেও সতর্ক করেন তিনি। বাড়তি পুলিশ ও সেনা মোতায়েন প্রয়োজন অনুযায়ী বহাল থাকবে; তবে রাতের বেলা সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ‘মরক্কো সেউতা বা স্পেনের বাকি অংশের জন্য কোনো হুমকি নয়। মরক্কো আমাদের সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য অংশীদার।’ গণ-অনুপ্রবেশের কোনো গোয়েন্দা তথ্য আগে থেকে ছিল না বলেও জানান তিনি।

সাক্ষাৎকার নেয়া অনেক অভিবাসী জানান, তারা কেবল নিজেদের ও পরিবারের জন্য উন্নত জীবন গড়ার সুযোগ চান। ইউরোপীয় নীতি অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী কারেল ল্যাননু আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইউরোপের কাছে যেসব দেশ কার্যত শত্রু, তারা মিলিতভাবে ইউরোপের দুর্বলতম জায়গা অর্থাৎ অভিবাসন খাতে ঐক্য ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করছে।’ তার ভাষ্য, ‘আমরা পুনরায় শিল্পায়ন করতে চাই, উৎপাদন খাতে শক্তিশালী হতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে কীভাবে কর্মী পাব, তা জানি না। ইউরোপে অভিবাসী দরকার, দক্ষ শ্রমিকের জন্যও দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনেক ইউরোপীয় দেশে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ খুব কঠোর।’

কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রণোদনায় মরক্কোই এই ঘটনার নেপথ্যে থাকতে পারে। ফিলিস্তিন ইস্যু এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি যুদ্ধ ইস্যুতে স্পেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৪ সালে ইসরাইলের জন্য অস্ত্র বহনকারী একটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজকে আলহেসিরাসে নোঙর করতে দেয়নি স্পেন। কিন্তু মরক্কো ওই যুদ্ধজাহাজকে স্বাগত জানিয়েছিল।

অনেকের ধারণা, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবেই মরক্কো এই অভিবাসী সংকটকে ব্যবহার করেছে। ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে মরক্কো সেউতা ও মেলিলার ওপর সার্বভৌম অধিকার দাবি করে আসছে। তবে স্পেন এ ব্যাপারে যেকোনো আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।

সেমব্রেরো বলেন, বুধবার থেকে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কার্যত ‘হাত গুটিয়ে বসে ছিল’। তার ধারণা, স্পেনকে আলোচনার টেবিলে বসাতে ‘সুযোগ কাজে লাগিয়েছে’ মরক্কো। তিনি বলেন, ‘সেউতা ও মরক্কোর সীমান্ত চিহ্নিতকারী ব্রেকিওয়াটার পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে পুলিশ ও সহায়ক বাহিনীর কড়া পাহারা পেরোতে হয়। এটি স্পষ্ট যে তাদের সচেতনভাবেই যেতে দেয়া হয়েছে।’ সেউতা ও মেলিলা অবজারভেটরির পরিচালক কার্লোস এশেভেরিয়া বলেছেন, ‘হাজার হাজার মানুষ অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সেটিকে “আগ্রাসন” বলা যেতেই পারে।’ এদিকে শনিবার মরক্কোর মানবাধিকার সংস্থা এই অনুপ্রবেশের কারণ ‘পুরোপুরি স্পষ্ট করতে’ স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

এই ঘটনাকে নিজের প্রচারণার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প। তিনি সেউতার পরিস্থিতিকে তার প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টির কঠোর অভিবাসন নীতির সঙ্গে জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘গতকাল স্পেনে যা দেখলাম, তা যেন লাখ লাখ মানুষের আগ্রাসন।’ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সঙ্গেও ট্রাম্প এই ইস্যুকে জুড়ে দিয়েছেন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘রিপাবলিকানরা নির্বাচিত না হলে আমাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে; বরং আরও অনেক বড় আকারে ঘটবে।’

শনিবার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্পেন সফরের ব্যাপারে ভ্রমণ সতর্কতা হালনাগাদ করেছে। সেউতার জন্য এটিকে লেভেল ৩-এ উন্নীত করা হয়েছে এবং অস্থিরতার কারণে মার্কিন নাগরিকদের সেউতা ভ্রমণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মরক্কো থেকে সেউতায় অভিবাসীদের বিশাল ও অনিয়ন্ত্রিত আগমনের ফলে অপ্রত্যাশিত ও বিপজ্জনক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পেনের পরিচালক এস্তেবান বেলট্রান স্পেন ও মরক্কো কর্তৃপক্ষকে এই পরিস্থিতির জবাবে মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নন-রেফুলমেন্ট নীতি সম্পূর্ণ; দলবদ্ধ বহিষ্কার সব ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ।’

এএম