গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সব রাজনৈতিক বিতর্ক গণমাধ্যমে ঝড় তুলতো, সেসবের জায়গা দখল করেছে খেলাধুলা ও বিনোদন অনুষ্ঠান। ২০১১ সালের বিপ্লবের অন্যতম কারণ এবং ২০২১ সালে সাঈদের ‘নিজস্ব অভ্যুত্থানের’ অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত অর্থনীতির অবস্থা এখন আরও ভঙ্গুর। তীব্র তাপদাহ ও দাবানলের মধ্যে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা, যা জনগণের ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে।
শনিবার রাজধানী তিউনিসের রাস্তায় হাজারো মানুষ প্রেসিডেন্টের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসন ও অবনতিশীল জীবনমানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। একই সময়ে পতাকা হাতে সাঈদের সমর্থকেরাও পাল্টা মিছিল বের করেছেন, যেখানে ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ কারাবন্দী করার দাবি ওঠে। গণমাধ্যমের ওপর ব্যাপক ধরপাকড়ে ভীত সাংবাদিকেরা এসব বিক্ষোভের সংবাদ পরিবেশনেও রেখেছেন সংযত অবস্থান।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তিউনিসিয়া পরিচালক সালসাবিল চেল্লালি আল-জাজিরাকে বলেন, দিন দিন এই বোধ প্রবল হচ্ছে যে সরকারের সমালোচনা আর সহ্য করা হবে না। তার ভাষ্য, ‘পাঁচ বছর আগে কায়েস সাঈদ তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে কবর দিয়ে দেশটিকে আবারও কর্তৃত্ববাদের পথে ঠেলে দিয়েছেন। তার শাসনামলে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে; বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে নিশানা করা হয়েছে।’
দেশজুড়ে দাবানলে এরই মধ্যে চার হাজার ৪০০ হেক্টর জমি ধ্বংস হয়েছে। ইতালি ও আলজেরিয়া সাহায্য পাঠালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানি ‘এসটিইজি’-র বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ফলে ফসল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
প্রতিশোধের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্লেষক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘কোনো কিছুরই পরিকল্পনা নেই। সাধারণত দেশগুলো জানে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা বাড়ে, তাই সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হয়। তিউনিসিয়ায় টাকা নেই, বিনিয়োগ নেই, কোনো পরিকল্পনাও নেই। মনে হচ্ছে আমরা এমন এক জাহাজে চড়েছি, যার নাবিকের নৌচালনার কোনো জ্ঞানই নেই।’
তবে সাঈদ এখনো সমাজের কোনো কোনো অংশে সমর্থন ধরে রেখেছেন। এসব সমর্থক অভ্যুত্থানের আগের সংসদের নানা কোন্দল ও ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেন। সংসদে চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্পিকার ইব্রাহিম বৌদারবালা নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও পানির সংকট নিয়ে ক্ষোভ যেন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে না যায়, সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
প্রেসিডেন্ট সাঈদ নিজেও বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এখনই বন্ধ করতে হবে।’ পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ করার চেষ্টা করলে রাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে।’
তিউনিসিয়ার সরকারের প্রায় সব সমালোচককে হয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে, নয়তো তারা নির্বাসনে চলে গেছেন। অভ্যুত্থানের আগের সংসদের সবচেয়ে বড় দল এন্নাহদার শীর্ষ নেতৃত্বের বেশির ভাগই এখন কারাগারে। এদের মধ্যে দলটির ৮৫ বছর বয়সী নেতা রাশেদ ঘানুশিও রয়েছেন। গত মাসে কারাগারের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে ঘানুশি কোথায় আছেন, কেমন আছেন—কেউই তা জানে না। ধারণা করা হচ্ছে, তীব্র গরমের কারণেই তার এমন অবস্থা হয়েছে।
সরকার যা কিছুকে ‘ভুয়া খবর’ বলে মনে করবে, তার বিরুদ্ধে আইন এবং একের পর এক গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের সমালোচক কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ভাষ্যকার হেইথাম এল মেক্কিকে এক বছরের কারাদণ্ড থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তিন বছর আগে সিফাক্সের একটি হাসপাতালের মর্গের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্টের কারণে তাকে এই সাজা দেয়া হয়।
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক হামজা মেদ্দেব বলেন, ‘সেন্সরশিপ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।’ তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অসুস্থ মানুষেরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং কিছু বয়স্ক মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। মেদ্দেব বলেন, ‘এই ক্ষোভকে কোথাও না কোথাও যেতে হবে। ফলে তা রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ ও পানি কোম্পানি, কখনো কখনো সরকারের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে; কিন্তু কখনোই প্রকৃত ক্ষমতাধর মানুষটির দিকে নয়—তিনি হলেন প্রেসিডেন্ট।’
সাঈদের এই ক্ষমতা কাঠামোর ভিত্তি মজবুত হয়েছে বহিরাগত শক্তিগুলোর সমর্থনেও। তিউনিসিয়ার উপকূল দিয়ে অভিবাসী পারাপারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গণতান্ত্রিক অবক্ষয় নিয়ে চিন্তিত না হয়ে স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ আলজেরিয়া ও লিবিয়াও অস্থির তিউনিসিয়া চায় না। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাদজিদ তেব্বুন এ সপ্তাহেই তিউনিসিয়ার স্থিতিশীলতার প্রতি যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন।
ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা পরিচালক রিকার্ডো ফাবিয়ানি বলেন, সাঈদের অধীনে তিউনিসিয়া তার নিজস্ব বিভ্রান্তির জগতে হারিয়ে যেতে থাকবে। তার ভাষ্য, ‘তিউনিসিয়ার বাইরের প্রায় সব অংশীদারই সংস্কারের আশা ছেড়ে দিয়েছে। যেসব দেশ এখনো আঁকড়ে ধরে আছে, যেমন ইতালি—যাদের অভিবাসন ইস্যুতে তিউনিসিয়ার সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে—তারাও এমন এক আমলাতন্ত্রের কারণে হতাশ, যারা ভুল করার ভয়ে কিছুই করতে চায় না।’
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য জানতে আল-জাজিরার পক্ষ থেকে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।





