মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী
ওশান ব্লু প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা, অর্থাৎ তিলের দানার সমান বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র। এর দুটি ধরন আছে। একটি হলো প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট আকারে তৈরি করা হয়, যেমন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড। আরেকটি হলো সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা বড় প্লাস্টিক পণ্য সূর্যের আলো, ঢেউ ও পরিবেশগত চাপে ধীরে ধীরে ভেঙে তৈরি হয়। যেহেতু প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে পঁচে যায় না, তাই এটি শুধু আরও ছোট ছোট টুকরোয় ভাঙতে থাকে। এক মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগের চেয়েও ছোট কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক।
আরও পড়ুন:
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস কোথায়
ওশান ব্লু প্রজেক্টের বিশ্লেষণ বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় উৎস বড় প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাঙন—পানির বোতল, ব্যাগ, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও খাবারের পাত্র। এছাড়া পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকের মতো কৃত্রিম কাপড় ধোয়ার সময় সূক্ষ্ম তন্তু বা মাইক্রোফাইবার নির্গত হয়, যা পরিশোধন ব্যবস্থা পেরিয়ে নদী ও সমুদ্রে পৌঁছে যায়। প্রসাধনীর মাইক্রোবিড, গাড়ির টায়ারের ঘর্ষণে সৃষ্ট কণা এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক দানা বা নার্ডলসও এ দূষণের বড় উৎস।
মার্কিন স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের প্রতিবেদক কাতিয়া সাভচুকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর অনুমিত ১ কোটি থেকে ৪ কোটি টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।
সমুদ্র ও প্রাণিজগতে প্রভাব
মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার পর তা তলানিতে জমে বা পানিতে ভাসতে থাকে। প্ল্যাংকটন থেকে শুরু করে মাছ ও তিমি—অনেক সামুদ্রিক প্রাণী একে খাবার ভেবে গ্রহণ করে। এতে তাদের স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণ ব্যাহত হয়, শরীরে ক্ষতি হয় এবং বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করে। ওশান ব্লু প্রজেক্ট জানাচ্ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক অনেকটা স্পঞ্জের মতো কীটনাশক ও ভারী ধাতুর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক শোষণ করতে পারে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ছোট প্রাণী থেকে বড় প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
মানুষের শরীরে কীভাবে ঢোকে
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষ প্রধানত খাবার, পানি ও শ্বাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। গবেষকদের ধারণা, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সপ্তাহে গড়ে একটি ক্রেডিট কার্ডের সমপরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, একজন গড় মার্কিন নাগরিক বছরে প্রায় ৩৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করেন।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডেসিরি লাবো বলেন, ‘প্লাস্টিক কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, এটি শুধু আরও সূক্ষ্ম কণায় ভেঙে যায়।’ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংস্থা ইপিএর সাবেক আঞ্চলিক প্রশাসক জুডিথ এনক বলেন, ‘এই প্লাস্টিক কণা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, যকৃত, এমনকি প্লাসেন্টা ও বুকের দুধেও জমা হচ্ছে।’
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
২০২৪ সালের মার্চে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ধমনি থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্লাক অপসারণ করা রোগীদের মধ্যে যাদের প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল, তাদের পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।
আরও পড়ুন:
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেচার মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মৃত ব্যক্তিদের দেহের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, যকৃত বা কিডনির তুলনায় মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব ৭ থেকে ৩০ গুণ বেশি। এতে আরও দেখা যায়, মৃত্যুর আগে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এই গবেষণার নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের টক্সিকোলজি অধ্যাপক ম্যাথু ক্যাম্পেন বলেন, ‘আমরা রীতিমতো হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’ তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এতে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি, বরং একটি সম্পর্ক দেখা গেছে মাত্র।
২০২৪ সালের শুরুতে ইতালির একদল গবেষক হৃদ্রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা রোগীদের ক্যারোটিড ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন। পরবর্তী তিন বছরে দেখা যায়, যাদের প্লাকে এই কণা ছিল, তাদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল সাড়ে চার গুণ বেশি।
২০২৪ সালের শেষদিকে চীনের একদল গবেষক কনুই, নিতম্ব বা কাঁধের প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার হওয়া রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এটি শারীরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিশু কান-নাক-গলা বিশেষজ্ঞ কারা মাইস্টার ও তার দল ২০২৪ সালের শুরুতে সুস্থ শিশুদের অস্ত্রোপচারে অপসারিত টনসিলে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের টনসিল টিস্যুর একটি বড় অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা শুধু পৃষ্ঠে নয়, ভেতরেও রয়েছে।’ একটি শিশুর টনসিলে মাইক্রোস্কোপে টেফলনের কণাও শনাক্ত হয়।
আরও পড়ুন:
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক জুয়ং ব্রায়ান কিমের প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক রক্তনালির আস্তরণের কোষে প্রবেশ করে জিন প্রকাশে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অস্বীকৃত প্রশ্নও অনেক
তবে গবেষকেরা একবাক্যে বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্দিষ্ট কোনো রোগের সরাসরি কারণ—এমন প্রমাণ এখনো নেই। যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ দূষণবিষয়ক অধ্যাপক ফে কুসেইরো বলেন, ‘এটি অ্যাসবেসটসের মতো নয়। এটি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষতি করবে না, বরং কোষের ক্ষতি করে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর একটি বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে, যা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।’
ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক স্টেফানি রাইট বলেন, পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিপুল বৈচিত্র্যের কারণে একে কোনো একক রোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা কঠিন। ২০২৫ সালের শুরুতে তার নেতৃত্বে লন্ডনের একটি গবেষণাগারে আটজন স্বেচ্ছাসেবীকে মাইক্রোপ্লাস্টিকমিশ্রিত তরল পান করিয়ে শরীরে তা কীভাবে শোষিত হয়, তা পরীক্ষা করা হয়। মিন্ডারু ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে হওয়া এই গবেষণার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রির সহযোগী অধ্যাপক ভেরেনা পিখলার বলেন, একক ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ শব্দটি প্লাস্টিকের বিপুল বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারে না। ইতালির ক্যাম্পানিয়া লুইজি ভানভিতেল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাফায়েল মারফেল্লা মনে করেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক প্রদাহ ও কোষের ক্ষতির মাধ্যমে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যদিও এই ধারণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
আরও পড়ুন:
নিউইয়র্কের মেডিকেল অনকোলজিস্ট নাওমি কো বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে স্তন ও কোলন ক্যানসার বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এর নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে অনুসন্ধান জরুরি হয়ে পড়েছে।’ তবে তিনিও সতর্ক করে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না।’
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ও ঝুঁকি
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৪ সালে মৃত্যুবরণকারীদের দেহে ২০১৬ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিক উৎপাদন বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকোর প্রজনন বিজ্ঞানের অধ্যাপক ট্রেসি উডরাফের মতে, ২০০৮ সালের পর থেকে বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে এবং ২০৬০ সালের মধ্যে তা তিন গুণ হতে পারে।
যা করা যেতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়ানো অসম্ভব হলেও এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ
- ওয়ানটাইম ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা
- তুলা, উল বা লিনেনের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর কাপড় ব্যবহার
- প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম না করা
- গরম চা বা পানীয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগ বা কাপ এড়িয়ে চলা
- রান্নাঘরে কাচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার
- এইচইপিএ ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার এবং নিয়মিত ঘর পরিষ্কার রাখা
ওশান ব্লু প্রজেক্টের মতো সংগঠনগুলো নদী ও সমুদ্রসৈকত থেকে বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে বড় প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন:
নীতিগত উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রসাধনীতে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্ত করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে সব কার্যক্রম থেকে ওয়ানটাইম ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বাদ দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষক ডেসিরি লাবো মনে করেন, প্রতিবছর অন্তত ৪৫ কোটি মেট্রিক টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হওয়ায় এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তিনি প্লাস্টিক উৎপাদনে সীমা নির্ধারণ ও বৈশ্বিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
গবেষকেরা একমত যে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: ওশান ব্লু প্রজেক্ট, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন, নেচার মেডিসিন, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এবং বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।


