ইসরাইলের একটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া এই স্প্রেডশিটে ১৫০-এর বেশি দাতব্য সংস্থার নাম, তাদের পরিচালকের নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, ইমেইল ও কাজের ক্ষেত্র উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ‘মন্তব্য’ কলামে ১৫টি সংস্থা সম্পর্কে বিশেষ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। যেমন—ফ্রান্সের ‘প্রেমিয়ার আর্জেন্স ইন্টারন্যাশনাল’-কে ‘ইসরাইলের সমালোচক’, জেনেভার ‘ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’-কে ‘ইসরাইল-বিরোধী প্রচারণায় জড়িত’ এবং স্পেনের ‘মুন্ডুবাত’-কে ‘বিডিএস (বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট, স্যাংশনস) আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিটিতে খ্যাতনামা সংস্থা অক্সফামকে ‘বৈশ্বিক বিডিএস প্রচেষ্টায় সক্রিয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অভিযোগ করা হয়েছে যে সংস্থাটি ‘ইসরাইলি বেসামরিক প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই’ অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে’ এনজিওগুলোকে উৎসাহিত করছে।
অক্সফাম আল জাজিরাকে জানিয়েছে, নথির মন্তব্যগুলো তাদের কাজের ‘নিরপেক্ষ মূল্যায়নের’ পরিবর্তে ‘অভিযোগ ও ব্যাখ্যাকে’ প্রতিফলিত করে। সংস্থাটির মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করি যেগুলোর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। অক্সফাম বিডিএস আন্দোলনকে সমর্থন বা প্রচার করে না।’ তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন করে এবং ইসরাইলি বসতিগুলো ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন’ করছে বলে মনে করে।
‘এর সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক নেই’
ফিলিস্তিনিদের চলাফেরার স্বাধীনতার জন্য কাজ করা ইসরাইলি এনজিও ‘গিশা’-র নির্বাহী পরিচালক তানিয়া হারি বলেন, এই নথির সঙ্গে ‘নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নেই’। বরং এটি ‘আরও একটি প্রমাণ যে ইসরাইল সরকার কয়েক দশক ধরে তাদের নৃশংস দখলদারিত্বের অধীনে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবন রক্ষাকারী কাজ করে যাওয়া সংস্থাগুলোর ওপর নজর রেখেছে।’ গিশা অবশ্য এই নথিতে নামের তালিকায় ছিল না।
স্প্রেডশিটটি ইসরাইলের কল্যাণ ও সমাজবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়টি আল জাজিরার অনুরোধে সাড়া দেয়নি। নথিটিতে বেশির ভাগ মন্তব্যের উৎস হিসেবে ‘এনজিও মনিটর’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ইসরাইলভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, যারা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা’ বলে দাবি করলেও তাদের ওয়েবসাইটে ‘যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইল-বিরোধী এনজিও নেটওয়ার্কের ম্যাপিং’-এর মতো প্রচারণা রয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মাইসুন সুকারেই এনজিও মনিটরকে একটি ‘ডানপন্থী’ সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেন, যারা ‘ফিলিস্তিনপন্থীদের ওপর নজরদারি করে’।
২০১৩ সালে ‘বিডিএসের কামড়’ অনুভব করেছিল ইসরাইল
২০১৩ সালের অক্টোবরে এই নথি তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময় ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্দোলন জোর পাচ্ছিল। সেই বছর প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ফিলিস্তিন দখলদারিত্বের কারণে ইসরাইলে একটি সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৭ সালে বিডিএস সমর্থকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে আইন পাসের চার বছর আগে থেকেই ইসরাইল সংস্থাগুলোর ওপর কীভাবে নজরদারি করত, এই নথি তা প্রমাণ করে। সুকারেই বলেন, ‘২০১৩ সালে ইসরাইল বিডিএসের কামড় অনুভব করতে শুরু করেছিল এবং মন্ত্রণালয় এসব সংস্থার বিভিন্ন দিক পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইছিল।’
ইউরোপিয়ান লিগ্যাল সাপোর্ট সেন্টারের পরিচালক জিওভান্নি ফাসিনা বলেন, ‘ইসরাইল যখন আইন পাস করে বিডিএসের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, সেই সময়েই এই তালিকা তৈরি হয়েছিল। ২০১১ সালে দেশটি এমন একটি আইন করে, যা ইসরাইল বা পশ্চিম তীরের বসতির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা একাডেমিক বয়কটের ডাক দেয়া যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।’
অহিংস আন্দোলনকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছে ইসরাইল
স্প্রেডশিটে উল্লেখ করা অন্যান্য সংস্থার মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের ‘ড্যানচার্চএইড’, সুইডেন-নরওয়ের ‘ডায়াকোনিয়া/এনএডি’, স্টকহোমের ‘কুইনা টিল কুইনা ফাউন্ডেশন’, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনস’, জার্মানির ‘মেডিকো ইন্টারন্যাশনাল’, ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল’ এবং যুক্তরাজ্যে সদর দপ্তরওয়ালা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল’।
মেডিকো ইন্টারন্যাশনালের রিয়াদ ওথমান আল জাজিরাকে বলেন, এই নথি ইসরাইলের ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার’ ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, তাদের সংস্থা বয়কট আন্দোলনকে সমর্থন বা এর ডাকও দেয়নি। ‘তবে আমরা প্রকাশ্যে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বয়কটের আহ্বান জানানোর অধিকারকে রক্ষা করেছি।’
সুইডেনের প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা সক্রিয় ছিলাম এবং এখনো গর্বের সঙ্গে বিডিএস আন্দোলনে সক্রিয় আছি। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল বলে আমরা মনে করি।’
গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ শুরুর পর এই এনজিও খাতের বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরাইল দাতব্য সংস্থাগুলোকে জীবন রক্ষাকারী ত্রাণ পাঠাতে বাধা দিয়েছে। বিদেশি স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং গাজায় কাজ চালিয়ে যেতে ৩৭টি এনজিওকে তাদের ফিলিস্তিনি কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের সুকারেই বলেন, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলো ফিলিস্তিনে ‘সব সময়’ উপস্থিত থেকে ‘অত্যাবশ্যকীয় কাজ’ করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ইসরাইল তাদের ওপর ‘বহু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং অবিরাম নজরদারি চালিয়েছে।’





