গণটিকা শেষেও থামছে না হামের দাপট; টিকাদানের হিসাব নিয়েই প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

হামে আক্রান্ত শিশু
হামে আক্রান্ত শিশু | ছবি : সংগৃহীত
0

গণটিকা কার্যক্রম শেষ হলেও কমছে না হামের প্রকোপ। প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে হাজারের বেশি শিশু। কমানো যাচ্ছে না মৃত্যুর সংখ্যাও। এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এখনও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকায় হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি টিকাদানের পুরো প্রক্রিয়া ও গণনা নিয়েও বিস্তর সন্দেহ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে টানা জুন পর্যন্ত দাপট চালায়। তবে জুনের শেষ দিকে কিছুটা কমে আসলেও চলতি মাসে আবারও বেড়েছে সংক্রমণ। হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে ভর্তির সংখ্যা। ৩০ আগস্ট পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৯ এবং উপসর্গ নিয়ে ৮৬৮ জনের প্রাণ গেছে।

হাসপাতালে ভর্তি অধিকাংশ রোগীই হামের টিকার আওতার বাইরে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেছে।

স্বজনরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পরও কমছে না হাম। এমনকি টিকা নেয়ার পরও আক্রান্ত হচ্ছে শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সময়ে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হয়েছে, তাতে এতোদিনে সারাদেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার কথা। উল্টো টিকা না পাওয়া শিশুর পাশাপাশি দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন- এমন শিশুরও নিশ্চিত হাম শনাক্ত বা উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা শিশু হাসপাতালে হামের সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করেছে আইসিডিডিআরবি। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশিই টিকা নেয়ার বয়স হয়নি। সংক্রামক ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স করে টিকা প্রতিরোধী জিনগত কোনো পরিবর্তন পায়নি সংস্থাটি।

তবে টিকা নেয়ার বয়সের আগে বা টিকা নেয়ার পরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে- তাদের পুষ্টিহীনতাসহ নানা কারণে ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আইসিডিডিআর‌বির সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র পরিচালক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাস খুবই লো। এই কারণে কি হয়, তাদের যে ইমিউন সিস্টেম ওইটাও তো ম্যাচিউর থাকে না। এই কারণেই কিন্তু অনেক বাচ্চাদের দেখা গেছে যে ভ্যাকসিন নেওয়া সত্ত্বেও তাদের এই প্রবলেমটা আছে।’

আরও পড়ুন:

সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, ‘৯ মাসের আগে আমরা টিকাটা দিতাম। এই ৯ মাসের সময়টুকুতে সে ইমিউনিটিটা কোথা থেকে পাচ্ছে, মায়ের বুকের দুধ থেকে। কারণ সে তো মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে, মায়ের থেকেই ইমিউনিটিটা পাচ্ছে। কিন্তু যখনই সে মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে না, তখনই কিন্তু সে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।’

চলতি বছর এপ্রিলে সারা দেশ গণটিকা কার্যক্রম শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। ইপিআই-এর দাবি, এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৮০ লাখ হলেও টিকা নিয়েছেন ১ কোটি ৯৬ লাখ। এরপরও ঠিক কেন তৈরি হচ্ছে না হার্ড ইমিউনিটি? এমন প্রশ্নে গণনায় স্বচ্ছতা আনতে টিকাদান প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশন করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুনশি বলেন, ‘যে মেশিনারিজের মাধ্যমে আমরা ভ্যাকসিনেশন দিচ্ছি, সেখানেও আমাদেরকে আরও নতুন নতুন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত, আমাদের ডিজিটালাইজেশন করা উচিত এই এই ভ্যাকসিনেশন দেয়ার রিপোর্টিং সিস্টেম।’

এদিকে, গণটিকা কর্মসূচি সম্পন্নের পর ইউনিসেফ দাবি করে- লক্ষ্যমাত্রার আওতায়ই আসেনি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিশু। আর জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এখনও কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা পৌঁছানো যায়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘কোন কোন বাড়িতে শিশুদের টিকা দেয়া হয়নি, এমনকি বড় যারা টিকা নেয়নি; ধরা গেল ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ তাদেরও টিকার আওতায় আনতে হবে।’

হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে গণটিকায় দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার কথাও বিবেচনায় আনার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এক ডোজে একেবারেই কোনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। সেই সেই ক্ষেত্রে তো অবশ্যই দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে।’

এফএস