প্রাক্তনকে পুরোপুরি ভুলতে সময় লাগে ৮ বছর: গবেষণা

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
0

প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে কষ্টে। সারাক্ষণ চেষ্টা করছেন তাকে মন থেকে মুছে ফেলতে, কিন্তু কিছুতেই পারছেন না। মনের কোণে বারবার একটিই প্রশ্ন জাগছে আর কত দিন বইতে হবে এই কষ্টের ভার? বিজ্ঞান বলছে, মনকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো চটজলদি কোনো উত্তর নেই। প্রাক্তনকে মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলে আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আপনার কেটে যেতে পারে দীর্ঘ আট বছর।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের একদল গবেষকের করা গবেষণায় এমনই এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। মনোবিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সোশ্যাল সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড পারসোনালিটি সায়েন্সে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, বিচ্ছেদের পর প্রাক্তনের প্রতি মনের টান অর্ধেক কমে আসতেই কেটে যায় প্রায় সোয়া চার বছর। আর সেই স্মৃতির বাঁধন পুরোপুরি ছিঁড়ে স্বাভাবিক হতে সময় লেগে যায় প্রায় আট বছর। গবেষকেরা বলছেন, যারা একটু বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা মানসিকভাবে স্পর্শকাতর, তাদের স্বাভাবিক হতে আরও বেশি সময় লাগে।

তবে একটি ইতিবাচক দিকও আছে। সন্তান আছে এমন প্রাক্তন দম্পতিদের ক্ষেত্রে শুরুতে আবেগের টান বেশি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা অন্যদের চেয়ে দ্রুত এই মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেন।

কিন্তু একটা মানুষকে ভুলতে কেন এত দীর্ঘ সময় লাগে? বিজ্ঞান বলছে, এটি আপনার মনের কোনো দুর্বলতা নয়। আমরা যখন কারও গভীর প্রেমে পড়ি, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটসিনের মতো ভালো লাগার হরমোনের বন্যা বয়ে যায়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে মস্তিষ্ক হঠাৎ করেই এই পরিচিত রসদ থেকে বঞ্চিত হয়। তখন মনের ভেতর যে তীব্র ছটফটানি ও শূন্যতা তৈরি হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখে তা মাদকাসক্ত মানুষের মাদক ছাড়ার কষ্টের মতোই যন্ত্রণাদায়ক।

স্মৃতি ভুলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও মস্তিষ্ক ভারী অদ্ভুত আচরণ করে। সম্পর্কের সাধারণ টুকিটাকি বিষয় বা দিনক্ষণ আমরা দ্রুত ভুলে গেলেও সেই দিনগুলোর ভালো লাগার অনুভূতি সহজে ফিকে হতে চায় না। স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশটি সাধারণ স্মৃতি জমা রাখে, যা সময়ের নিয়মে মুছে যায়। কিন্তু আবেগের স্মৃতি জমা থাকে অ্যামিগডালা নামের আরেকটি অংশে, যা সহজে নষ্ট হয় না। সে কারণেই হয়তো প্রাক্তনের সঙ্গে কোন রেস্তোরাঁয় বসেছিলেন, সেই নামটি ভুলে গেলেও সেখানে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনুভূতি ঠিকই হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায়।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বিচ্ছেদের পর প্রাক্তনের সঙ্গে যেকোনো উপায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা এই কষ্ট কাটিয়ে ওঠার পথকে আরও দীর্ঘ করে তোলে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের প্রোফাইলে উঁকিঝুঁকি মারলে মস্তিষ্কের সেই ভালো লাগার পথগুলো আবার সচল হয়ে ওঠে, যা আপনাকে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে দেবে না।

সাধারণত এই কষ্ট কাটিয়ে ওঠার কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ রয়েছে। প্রথমে ধাক্কা খাওয়া ও ঘটনাটি মেনে নিতে না পারা, এরপর তীব্র ক্ষোভ ও রাগ হওয়া, প্রাক্তনকে ফিরে পাওয়ার জন্য মনে মনে আকুতি করা, গভীর বিষণ্নতা এবং সবশেষে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নতুন করে জীবন সাজানো। তবে বিচ্ছেদের এই বেদনা যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে আপনার দৈনন্দিন জীবনকে অচল করে রাখে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক্তনকে ভোলার কোনো জাদুকরি দাওয়াই নেই। একমাত্র সময় ও দূরত্বই পারে এই ক্ষত উপশম করতে। প্রাক্তনের থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা ও নতুন রুটিন তৈরি করলে ধীরে ধীরে মন শান্ত হয়ে আসে। কষ্ট একবারে যায় না, তবে সময়ের প্রলেপে কষ্টের তীব্রতা ঠিকই কমে আসে।

—সাইন্স ইনসাইড ও সেইজ জানার্লের প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম