অভিবাসন নিয়ে দেশে প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ‘হাউ ডু ইউ ডু’

বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেয়া হচ্ছে
বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেয়া হচ্ছে | ছবি : সংগৃহীত
0

বাংলাদেশের প্রথম অভিবাসন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা ও উৎসব ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্টের ২০২৬’ জাতীয় বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে আবির ফেরদৌস মুখরের ‘হাউ ডু ইউ ডু’। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা হয়েছে তুরস্কের পরিচালক আদার বারান ডেগারের ‘দ্য কোল্ড’।

জাতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে সৈয়দ সাহিল ও রাকায়েত রাব্বী নির্মিত ‘মাটি’ এবং তৃতীয় হয়েছে ইফফাত রওনাক প্রমির ‘দ্য লাস্ট প্যাসেজ’। আন্তর্জাতিক বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে ইরানের পরিচালক মোসায়েব হানাইয়ের ‘ওভারলোড’ এবং তৃতীয় হয়েছে ভেনেজুয়েলার পরিচালক রিকার্দো মুনোজ সিনিয়রের ‘অ্যান আইল্যান্ড’।

গতকাল (বুধবার, ২৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু অনেকেই প্রতারণার শিকার হন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অনেক তরুণ দালালচক্রের প্রলোভনে বিদেশে যান। অথচ তারাই দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন। তাই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল, সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করতে হবে। যারা বিদেশে যেতে চান, তাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথ নিশ্চিত করতে হবে। দিনশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, অভিবাসন শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানুষের গল্প। ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় পাশে থাকবে।’

অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যান, কিন্তু সেই যাত্রা সবসময় সুখকর নয়। সফলতার গল্প যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বঞ্চনা, প্রতারণা ও কষ্টের গল্প। নির্মাতারা সেই বাস্তব গল্পগুলো তুলে এনেছেন, যা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন।’

বাংলাদেশে ইতালি দূতাবাসের মাইগ্রেশন অ্যাটাশে জিওসেপ্পে দি জিওভান্নি বলেন, ‘অনেকে মনে করেন ইতালি যেতে ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার লাগে। অথচ ইতালির ভিসা ফি মাত্র ৬১ থেকে ১০০ ডলার। এই বিপুল অর্থ নেয় দালালচক্র। বাংলাদেশ ও ইতালির অপরাধী নেটওয়ার্ক মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে শোষণ করছে। আমরা এই চক্র ভেঙে দিতে কাজ করছি, তবে এজন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বলতে চাই, লিবিয়া হয়ে অনিয়মিতভাবে নৌপথে ইতালিতে পৌঁছালে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। আমাদের আইন এখন অনেক কঠোর।’

চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন বলেন, ‘শিল্প ও গল্প বলার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসন নিয়ে আরও গভীর সামাজিক আলোচনা তৈরি করা সম্ভব। এ ধরনের উৎসব নতুন নির্মাতাদের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জুরি বোর্ডের সদস্য রাহনুমা সালাম খান বলেন, ‘অভিবাসন ও মানব পাচারের মতো জটিল মানবিক সংকটকে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আব্দুর রহমান এ উদ্যোগের প্রশংসা করে ভবিষ্যতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

আরও পড়ুন:

স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ‘শ্রম অভিবাসনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নের গল্প। অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ উৎস দেশগুলোর একটি। একইভাবে বঙ্গোপসাগর হয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা প্রাণ হারাচ্ছেন। বিদেশে কাজের আশায় গিয়ে অসংখ্য মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতেই আমরা এই চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছি।’

অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো এই ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’ আয়োজন করা হয়।

গত ১ এপ্রিল গুগল ফর্ম এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্ম ফিল্মফ্রিওয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র আহ্বান করা হয়। বিশ্বের ২৪টি দেশ থেকে এক হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্র জমা পড়ে। তিন মাসব্যাপী এ আয়োজনে নির্মাতাদের জন্য ছয়টি মেন্টরশিপ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫৭টি চলচ্চিত্র বাছাই করা হয়। পরে জাতীয় বিভাগে ১৩টি এবং আন্তর্জাতিক বিভাগে ১০টিসহ মোট ২৩টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়।

বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ব্রাজিল, কানাডা, কোস্টারিকা, সাইপ্রাস, মিসর, ফ্রান্স, ভারত, ইরান, ইসরায়েল, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, তুরস্ক, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা ও ভিয়েতনাম থেকে নির্মাতারা চলচ্চিত্র জমা দেন।

জুরি বোর্ডে ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিমেল আশরাফ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাহনুমা সালাম খান এবং সিনেমাটোগ্রাফার ও চলচ্চিত্র পরিচালক সাহিল রনি। চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্বাচন করা হয়।

জাতীয় বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পরিচালক আবির ফেরদৌস মুখর বলেন, ‘চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম। যারা অভিবাসনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন কিংবা হতে পারেন, তারা এসব চলচ্চিত্র দেখে নিরাপদ অভিবাসনের গুরুত্ব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

এফএস