রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের অনুমোদন; সরবরাহ শুরু হতে পারে ডিসেম্বরে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র | ছবি: সংগৃহীত
0

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করতে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। ভৌত পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার পর আজ (বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর) বিকেলে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে আরও এক ধাপ এগোল দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এ পর্যায়কে ‘পাওয়ার স্টার্ট’ বা ‘সি-স্টেজ’ বলা হচ্ছে। এ ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর, বিদ্যুৎ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার নিরাপদ এবং স্থিতিশীল কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে এসব ব্যবস্থার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকেলেই পাওয়ার স্টার্ট বা সি-স্টেজের অনুমোদন দিয়েছে বায়েরা। এ পর্যায়েও বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। শুরুতে শূন্য শক্তি উৎপাদন থেকে ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।’

বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর আগে ভৌত পরীক্ষা চালানো হয়। চুল্লিপাত্রের ভেতরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার আচরণ এবং উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করা হয় এ পরীক্ষায়। এর ফলাফল পর্যালোচনা করেই পরবর্তী ধাপ শুরুর অনুমতি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

গত সেপ্টেম্বরে রূপপুরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা ছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। পরে পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে বায়েরার অনুমোদন পাওয়ার পর ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়।

পরবর্তী ধাপে প্রথমে সীমিত পরিসরে তাপশক্তি উৎপাদন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়ানো হবে। পারমাণবিক জ্বালানির বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্পের চাপে ঘুরবে টারবাইন, যা জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে উন্নীত হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। তখন প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, যা আগামী ডিসেম্বরে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ধারণা, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরও সাত থেকে আট মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে। এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। প্রতিটি ধাপেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, নির্ধারিত পদ্ধতি এবং নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান এনপিসিবিএল। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট এখানে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হবে বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জ্বালানি গ্রহণের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশের নাম যুক্ত হয়।

রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সব মিলিয়ে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

এফএস