এসো শারদপ্রাতের পথিক, এসো শিউলি বিছানো পথে। এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে, এসো অরুণকিরণ রথে।
শরতের মেঘভাসা আকাশের দিকে তাকিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখন দিন গুনছেন পিতৃপক্ষ অবসানের।
কৈলাশ থেকে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গার আগমন নিয়ে চলছে তোড়জোড়। মৃৎশিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে দেবীর দশভূজা রূপ। খড় ও মাটির কাজ শেষে আঁচড় পড়ছে রং-তুলির।
প্রতিমা তৈরির কারিগরদের মধ্যে একজন বলেন, ‘যতই দিন ঘনিয়ে আসছে ততই আমাদের কাজ কাজের ব্যস্ততা বাইরে যাচ্ছে।’
অন্য একজন বলেন, ‘আগে তো ছিল এক চালের মধ্যে বাংলা কাজ ছিল। আর এখন নতুন নতুন যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছবি দিচ্ছে আমাদের এইভাবে কাজ করে দিতে হইতেছে।’
ব্যস্ততা আছে রাজধানীর শাখারীবাজারে ধর্মীয় আচার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ দেবী দুর্গতিনাশিনীর সাজসজ্জা ও অলঙ্কার বিক্রিতেও।
বিক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা যেভাবে ড্রেস পরি ঠাকুরকে আগে পরাতে হয়। গোপালের ড্রেস, রাধাকৃষ্ণের ড্রেস, তারপর গৌর নিতাইয়ের ড্রেস, সব উনাদের আগে পরাতে হয় তারপরে নিজেরা পরতে হয়।’
অন্য একজন বলেন, ‘প্রতিদিনটাই আমাদের পুজা পূজা মনে হয়। মানে বিক্রি করছি, সাথে সাথে উপভোগ করছি পুজার।’
আরও পড়ুন:
অন্য এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে একটু ভালো বেশি বিগ বাজেটের চাইছে, এখন চাইছে শুধু নরমাল নরমাল কাজ চায়। মানে কম পয়সার জিনিসপত্র কিনতে চায়।’
ক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘এখন ঠাকুরের জন্য আগে জিনিস কিনবো, তারপরে নিজেদের জন্য কেনাকাটা।’
এছাড়া বাঙালি হিন্দু নারীদের বিবাহিত জীবনের চিহ্ন শাখার আবেদনও বেশি থাকে এ সময়। স্বামীর মঙ্গলের জন্য হাতে এই অলঙ্কার পরা নারীরা বিভিন্ন আধুনিক নকশার শাখা কিনতে ছুটে আসেন এই বাজারে।
একজন নারী বলেন, ‘আমাদের পূজা উপলক্ষে তো হাত ভরে সবাই পরার জন্য খুব ইচ্ছুক। সেজন্যই শাখা পরা।’
অন্য একজন বলেন, ‘পার্বতী শিবের জন্য পরতো, সেই হিসেবে হিন্দু নারীরা এখন পর্যন্ত এবং আগামীতেও এই শাখা, কলা, সিঁদুর পরে যাবে।’
বিক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আগে হাতে মানে ওইযে ই দিয়ে করাত দিয়ে কাটতো, আর এখন হয়ে গেছে মেশিনে অত্যাধুনিক ডিজাইন।’
যে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে উৎসব আসে আমাদের মাঝে, তা কতটুকু গ্রহণ করতে পেরেছি আমরা? এ পৃথিবীর একদিকে ধর্ম, বর্ণ আর জাতিগত বিভেদ, অন্যদিকে আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এরই বা শেষ কোথায়?
রাতের আঁধারে প্রতিমা ভাঙচুর, আবার দিনের আলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে উৎসব পালনের যে মহা সতর্কতা, সেই সতর্কতা কি বাংলাদেশকে এক বৃত্তে বারবার ঘুরেফিরে আবদ্ধ করে রাখছে?
আরও পড়ুন:
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ‘এই দ্বন্দ্ব, সংঘাত যেটা আসলে চাপিয়ে দেয়া, যেটা তৈরি করা, এটা কোনো একটা কাঠামো আসলে তৈরি করছে। এখান থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় বাংলাদেশের মানুষের উপরে বিশ্বাস রাখা।’
মহিষাসুরমর্দিনীর এবছরের আগমনী বাহন ঘোটক, যা বার্তা দিচ্ছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার। একইসঙ্গে বহু যুগ পর এবারই প্রথম মহাশপ্তমী হবে দুই দিনব্যাপী, যা ইঙ্গিত দেয় এ ধরণীকে সতর্ক হওয়ার।
মহানগর কেন্দ্রীয় পূজা মন্ডপের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী বলেন, ‘এ পৃথিবীতে যখন এই মাতৃ ভাণ্ডারে, মাতৃ দেবালয়ে পাপে তাপে অনাচারে অত্যাচারে যখন স্বয়ং সবকিছুতে অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে, তার জন্য একদিন বাড়তি সময় নিয়ে মা এই সমস্ত অপূর্ণ থেকে মা সবকিছুর থেকে পরিপূর্ণ করবেন।’
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘বার্তাগুলোতে বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের যে অশুভ একটা লক্ষণ আমাদেরকে সতর্ক করে ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
শেষমেশ সব সংকট কাটিয়ে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন ও দেবীর আরাধনা করে সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা করছেন বৈদিক ধর্মাবলম্বীরা।





