‘ফ্যামিলি কার্ডে’ ২৮ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পারে: বিশ্বব্যাংক

ফ্যামিলি কার্ডসহ প্রতীকী ছবি
ফ্যামিলি কার্ডসহ প্রতীকী ছবি | ছবি: এআই জেনারেডেট
0

বাংলাদেশ সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা ও খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, তবে দেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব। গতকাল (মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ (অক্টোবর ২০২৬) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

‘ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দরিদ্রদের জন্য আরও কার্যকর করা’ শিরোনামের এ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ কোনো প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। অথচ সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৩১ শতাংশ এ সুবিধা ভোগ করছেন। এই বৈষম্য দূর করে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া গেলে দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ফলাফল পাওয়া যাবে।

দুই পদ্ধতিতে দুই ফলাফল
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পদ্ধতিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করলে যদি বিদ্যমান নগদ কর্মসূচির মতো একই ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণের ত্রুটি থেকে যায় তবে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবেন, যা দারিদ্র্যের হার ০ দশমিক ৯৫ শতাংশ পয়েন্ট কমাবে।

কিন্তু কার্ডটি যদি উন্নতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার মতো কর্মসূচির সঙ্গে এবং একটি একক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তবে দারিদ্র্য আরও ১ দশমিক ৭২ শতাংশ পয়েন্ট কমবে, যা প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের সমান। এই অতিরিক্ত ব্যয় হবে জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ২১ শতাংশ।

টানা চতুর্থ বছর দারিদ্র্য বাড়ছে
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা (দৈনিক ৩ ডলার) অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ পলিসি কেমন
চলতি বছরের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এটি মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের একটি প্রধান অঙ্গীকার ছিলো। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই ডিজিটাল কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোকে একটি একক ডাটাবেজের আওতায় এনে সরাসরি আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দেয়া। পর্যায়ক্রমে প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মসূচির মেরুদণ্ড হলো ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ (ডিএসআর) একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ, যা নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, বিদ্যুৎ বিল, ভূমি রেকর্ড ও কর তথ্য একীভূত রাখে। সুবিধাভোগীরা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মাসিক নগদ সহায়তা পান।

গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন সুবিধাভোগীর মধ্যে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এই ডিএসআর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ২০২৫ সালে ৩৯০ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।

অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত এক দশকের গড় ৫ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ও সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন তৃতীয় প্রান্তিকে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে, যা মহামারির পর প্রথম ত্রৈমাসিক সংকোচন।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এই হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঋণপ্রবাহ ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন।

বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ
প্রতিবেদনে চারটি মূল সংস্কারের সুপারিশ গুলো হলো—
১. ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ করা।
২. একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা।
৩. ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় বাড়ানো এবং লক্ষ্য নির্ধারণ উন্নত করা।
৪. ব্যাপক ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম বলেন, ‘দরিদ্রদের সুরক্ষার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে সাড়া দিতে হবে। এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।’

এএম