বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, তদন্তে ঘাটতি-বিলম্বই কারণ—বলছেন বিশ্লেষকরা

প্রতীকী ছবি (এআই জেনারেটেড)
প্রতীকী ছবি (এআই জেনারেটেড) | ছবি: এখন টিভি
0

সরকারের প্রথম ৭ মাসে পুলিশের দেয়া হিসাব বলছে, প্রতিদিন গড়ে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু জুলাই মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯৮ জন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধের ঘটনায় কার্যকর তদন্তে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, অহরহ জামিনও মিলছে খুনের মামলায়। তাদের তাগিদ, দ্রুত বিচার করে বিচারহীনতার পুরনো সংস্কৃতির বদলের।

জীবনের শেষ বয়সে গনপতি চেয়েছিলো শান্তির নীড়। পেনশনের টাকায় কাজও ধরেছিলেন। তবে কে জানতো সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তৈরি করা ঘরেই পরিবারসহ হত্যার শিকার হতে হবে তাকে।

এবার চলতি মাসের ১২ তারিখের একটি ঘটনার দিকে নজর দেয়া যাক। ঘরের মধ্যে ঠিক একইভাবে প্রবাসী দম্পতি ও কাজের মেয়েকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

জুন মাসে লক্ষিপুরে রায়পুরে ঘরে ঘরে মা ও ৩ মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে ঘরে মধ্যে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। গত কয়েক মাস ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যার ঘটনা দেখে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।

পুলিশ হেড কোয়ার্টারের হিসেব বলছে, জানুয়ারিতে হত্যা হয়েছে ২৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চ ৩১৭, এপ্রিল ২৮৮, মে ৩১০, জুল ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এছাড়া জুন থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩ মাসে রাজধানীতে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৬০টি। যার মধ্যে পারিবারিক কলহে খুন হয়েছে ১৪ জন, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হয়েছে ১০ জন, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে খুন হয়েছে ৪ জন, জমি সংক্রান্ত ঘটনায় খুন হয়েছে ১ জন, পূর্ব শত্রুতা জেরে খুন হয়েছে ৮ জন, নারী ও শিশু সংক্রান্ত ৩ জন ও অন্যান্য কারণে ১৮ জন খুন হয়েছে।

পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। খুনের ঘটনায় উদ্বেগের কিছু নেই। মিডিয়া পুলিশ হেড কোয়ার্টারের এআইজি এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘পরিসংখ্যান যদি দেখেন, অন অ্যাভারেজ প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ খুন হয়। এটা কিন্তু এমন না যে, খুনের সংখ্যা বেড়েছে। এখন যেটা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কয়েকটি ঘটনা নিয়ে মানুষ খুব বেশি আলোচনা করে এবং অনেকে আতঙ্কেও ভোগে।’

খুনের ঘটনায় মামলা হয়, তবুও জামিন পাওয়ার ঘটনা প্রতিদিনের— কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছিলো আইনজীবী রেদওয়ান আহমেদ রানজিবের কাছে।

তিনি বলেন, ‘যদি তার এফআইআর, চার্জশিট, সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট—এগুলো যদি দক্ষ লোকের সঠিকভাবে বিবেচনা করে তৈরি করা হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমরা জানি যে, যত দেরি হবে, ততই এভিডেন্সগুলো নষ্ট হতে থাকে। এতে আসামির জন্য মামলা থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। এর পেছনের কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও আইন বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘আমাদের দেশের সবাই টাকা উপার্জন করতে চায়, কিন্তু সেটার জন্য যতটা পরিশ্রম করতে হবে, সেটা তারা করতে চায় না। খুব সহজে বড় উপার্জন তারা করতে চায়। এর ফলশ্রুতিতে এই সমস্যাগুলো এখানে বাড়ছে। তার দরকার টাকা, ক্ষুধা নিবারণ করা, টাকা জেনারেট করা। কীভাবে করবে? এর জন্য দুটো পন্থা আছে, হয় সে অপরাধ করবে, অথবা পরিশ্রম করবে। সে পরিশ্রমই করতো, কিন্তু কোনো কারণে তার পরিশ্রম করার সুযোগ নেই, তাই সে দ্বিতীয় পন্থাটা অবলম্বন করবে।’

হত্যার কারণ ভিন্ন হলেও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরই প্রশ্ন ওঠে, কেন থামছে না সহিংসতা? অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্রত বিচার, সামাজিক বিরোধের মীমাংসা, অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তদন্ত হত্যাকাণ্ড কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখতে পারে।

এসএইচ