ভূমিকম্প ছিল না, হিমবাহ ধসই মূল কারণ
দুর্যোগের পরপরই ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা জানান। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরে তাদের মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প বলে ধারণা করা সিসমিক সংকেতটি আসলে হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট কম্পন ছিল। ইউএসজিএস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, ‘সিসমিক ঘটনাটি ছিল হিমবাহ ধস ও পাথর-কাদার প্রবাহ, যা ডাউনস্ট্রিমের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি।’
কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগার জানান, প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় প্রায় ০.২ বর্গকিলোমিটার বরফের একটি অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় পড়ে। এটি রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি করে। শুগার বলেন, ‘প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে উপত্যকায় পড়েছে। আরও লক্ষণীয়, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় প্রচুর তুষার গলে গেছে, যা অস্বাভাবিক উষ্ণতার ইঙ্গিত দেয়।’
বরফ-পাথরের ধস কীভাবে বন্যা সৃষ্টি করলো
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (আইসিআইএমওডি) দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ সস্বত সান্যাল জানান, ‘লেন্দে খোলা নদী ১৪ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এবার নেপালের দিকে একটি হিমবাহ থেকে বরফ-পাথরের ধস নদীটি বন্ধ করে দেয় এবং ডাউনস্ট্রিম-এ হঠাৎ পানির তোড়ে বন্যা সৃষ্টি করে।’
আইসিআইএমওডি-র জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিংগং ঝাং জানান, প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, নেপালের দিকে লেন্দে নদীতে একটি বরফ-পাথরের ধস নদী বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আপস্ট্রিমে পানি জমতে থাকে এবং প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে ডাউন স্ট্রিমে এ প্রবল বন্যা সৃষ্টি হয়। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ওপরের দিকে একটি বাধা আটকে আছে, যা দ্বিতীয় বন্যার কারণ হতে পারে।
মেলবোর্নের মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহবিদ অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকিনটশ বলেন, 'যখন এত বড় একটি হিমবাহ ধসে পড়ে, তখন প্রচুর পানি সৃষ্টি হয়। এরপর পানি ও পাথরকণা একত্রিত হয়ে প্রবল বন্যায় রূপ নেয়।' তিনি বলেন, ‘এই ধরনের বড় হিমবাহ ধসের ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। একজন হিমবাহবিদ হিসেবে এগুলো দেখে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না।’
আরও পড়ুন:
জলবায়ু পরিবর্তন কি দায়ী?
এই নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে তারা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধি এই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের উষ্ণতা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। নেপালের হিমবাহ প্রায় তিন দশকে তাদের এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ২০১১-২০২০ সময়ে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে বরফ হারিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হেনরিখ বলেন, ‘হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ধারা আমরা দেখছি তাড়াতাড়ি উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলা, পারমাফ্রস্ট কমে যাওয়া—এসব ভূমিধস ও হিমবাহ হ্রদ স্ফীতির মতো ঘটনা ঘটাতে পারে।’
উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গললে পার্বত্য ঢালগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। হিমবাহ সরে গেলে পাহাড়ি ঢালে থাকা শিলাখণ্ডের আঁকড়ে থাকার ‘আঠা’ যেমন পারমাফ্রস্ট (স্থায়ী হিমায়িত মাটি) গলে যায়, ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।
অধ্যাপক ম্যাকিনটশ বলেন, আমরা নিশ্চিত জানি যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাচ্ছে। কিন্তু হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো বক্তব্য দেয়া সম্ভব নয়। কারণ এ ধরনের ঘটনা এত কম নথিভুক্ত হয়েছে যে, পরিসংখ্যানগতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে আসা কঠিন।’
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় ২০০ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই ভোতেকোশি নদীতেও হিমবাহ হ্রদ স্ফীতির কারণে বন্যা হয়েছিল, যাতে ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।
আগাম সতর্কতা সম্ভব নয়
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস সান আন্তোনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ হাতিম শরিফ বলেন, এই দুর্যোগের একটি বিষয় যা তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে, তা হলো দুর্যোগের আগে কোনো বৃষ্টিপাত ছিল না। তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্বের প্রায় সব অপারেশনাল বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকেই ব্যর্থ করে দেয়।’
শরিফ বলেন, ‘যখন কাদার প্রবাহ চোখে পড়ে, তখন দৌড়িয়েও রক্ষা পাওয়া যায় না। দৌড়ানো কাজে দেবে না, গাড়িতেও পালানো সম্ভব নয়, কারণ দ্রুতগতিতে চলমান কাদা ও পানি তরল কংক্রিটের মতো ভয়াবহ সংমিশ্রণ তৈরি করে।’ তার মতে, একমাত্র সমাধান হলো উঁচু পাহাড়ে ওঠা, কমপক্ষে ২০ ফুট (৬ মিটার) ওপরে।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে নদীর পানির উচ্চতা পরিমাপক যন্ত্র বসানো, যা কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক তথ্য দেবে এবং বাসিন্দাদের ২০-৩০ মিনিট আগে সতর্ক করতে পারবে।
হিমবাহ হ্রদ স্ফীতির ঝুঁকিও রয়েছে
নেপালে হিমবাহ হ্রদ স্ফীতির (জিএলওএফ) ঝুঁকিও রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হয়েছে। হিমবাহ গলার ফলে তৈরি এসব হ্রদ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
আইসিআইএমওডি-র কিংগং ঝাং বলেছেন, উজানের দিকে একটি বাধা এখনো আটকে থাকায় দ্বিতীয় বন্যা হতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
নেপাল পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি পর্যটক। অন্যদিকে তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং ক্যানাডার ২৫ জন নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজদের একটি বড় অংশই হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান তিব্বতের কৈলাশ মানসরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশের ৫ হাজারের বেশি সদস্য কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। ভারত ইতিমধ্যে ১০ টন জরুরি ত্রাণ ও ওষুধ পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার এবং রেড ক্রস ১২ লাখ ডলার জরুরি তহবিল প্রদান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সঠিক মানচিত্র তৈরিতে তাদের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে।
—রয়টার্স, বিবিসি আল জাজিরার, ইনকুয়ার ডটনেট ও সিএনএনের প্রতিবেদন অবলম্বনে





