সমাবেশে অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রকল্প কোনো টেকসই প্রকল্প নয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস হবে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির মজুতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এর ফলে পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনাতেও এই প্রকল্পের ক্ষতিকর দিকগুলো বারবার উঠে এসেছে।’
বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে নয়, বরং জনগণের স্বার্থ ও পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি নীতি প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে বক্তারা ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে বাতিলের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ফুলবাড়ী উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম জুয়েল।
আরও পড়ুন:
এর আগে সমাবেশ শুরুর প্রাক্কালে অধ্যাপক আনু মোহাম্মদসহ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা একটি বিক্ষোভ র্যালিতে অংশ নেন। র্যালি থেকে লাল কার্ড প্রদর্শন করে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বিতাড়নের দাবি জানান নেতারা।
প্রেক্ষাপট: ২০ বছর আগের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল-গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
মিছিলটি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সেদিন ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে তৎকালীন বিডিআর ও পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামের তিন তরুণ নিহত এবং দুই শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।
এ ঘটনার স্মরণেই প্রতিবছর ২৬ আগস্ট দিনটি ‘ফুলবাড়ী দিবস’ বা ‘ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবছর এই আন্দোলনের ২০ বছর পূর্তি হলো।
আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছয় দফাভিত্তিক একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল, যাতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা এবং এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহারের অঙ্গীকার ছিল। তবে দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও হয়নি বলে অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা।
আরও পড়ুন:
খনির সম্ভাবনা ও বিতর্ক
১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান বিএইচপির সঙ্গে চুক্তি করেছিল সরকার, পরবর্তীতে এশিয়া এনার্জির (বর্তমানে জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসি নামে পরিচিত) সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি সম্পাদিত হয়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কোম্পানিটি ফুলবাড়ী উপজেলার চারটি থানা এলাকার প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করে গভীর গর্ত খুঁড়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুলে তা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা করেছিল, যার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেত সামান্য অংশ।
স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে খনন হলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, বসতভিটা ও জলাধার স্থায়ীভাবে বিনষ্ট হতো।
উল্লেখ্য, দেশের কয়লা খনি নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। সম্প্রতি কিছু মহল থেকে নিরপেক্ষ সমীক্ষার ভিত্তিতে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের পক্ষে আলোচনা চালানোর মতও উঠে এসেছে, যদিও তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষা কমিটি এই অবস্থানের বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে এবং উন্মুক্ত পদ্ধতি প্রত্যাখ্যানের দাবিতে অনড় রয়েছে।





