ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত পদে যেতে চাইছেন না কেউই; বিপাকে জেলেনস্কি

ভলোদিমির জেলেনস্কি
ভলোদিমির জেলেনস্কি | ছবি: সিএনএন
0

ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন একটি বড় সংকটে পড়েছেন। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে কঠিন এই কাজ কেউই করতে চাইছেন না। যুদ্ধের এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কিয়েভের প্রতিনিধিত্ব করার মতো যথেষ্ট প্রভাবশালী কাউকে খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট। সম্ভাব্য প্রার্থীরা এই কঠিন দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। ইউক্রেনের দুইজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও চারজন আইনপ্রণেতার বরাত দিয়ে পলিটিকো এ তথ্য জানিয়েছেন।

আগের রাষ্ট্রদূত ওলগা স্টেফানিশিনার জায়গা পূরণের প্রয়োজনীয়তাই জেলেনস্কির অসম্পূর্ণ থাকা সরকারি রদবদলকে ত্বরান্বিত করেছিল। আসন্ন আত্মসাৎ মামলার কারণে গত ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত হন স্টেফানিশিনা।

সাবেক এক জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা ও এই পরিবর্তনের পটভূমি সম্পর্কে অবগত এক রিপাবলিকান পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে রাষ্ট্রদূত পদের প্রস্তাব দেয়ার জন্যই জেলেনস্কি তার রদবদলের পরিকল্পনা এগিয়ে আনেন। কিন্তু সভিরিদেঙ্কো এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে জেলেনস্কির পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

জেলেনস্কি জুলাইয়ের শেষদিকে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে আমি ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোর ওপর ভরসা রেখেছিলাম এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের পদটি প্রস্তাব করেছিলাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, তিনি সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন একজন প্রার্থী খুঁজছেন‘একজন উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তি।’

তবে এরপর থেকে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও একইভাবে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অননুমেয় হোয়াইট হাউস সামলানোর এই এমনিতেই কঠিন কাজে যেতে চাইছেন না তারা।

জেলেনস্কির নিয়মিত সমালোচক ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ইভান্না ক্লিমপুশ-সিনসাদজে বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত পদের জন্য যথেষ্ট প্রভাব ও দক্ষতাসম্পন্ন ইউক্রেনীয়রা এটিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। কারণ তারা উদ্বিগ্ন যে সঠিকভাবে কাজ করার জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, সেটি তারা পাবেন না। প্রেসিডেন্টের আস্থা কিংবা তার কানের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ছাড়া এই দায়িত্ব পালন অসম্ভব।’ এতে জেলেনস্কির বিকল্প অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। তার ভাষ্য, এই ব্যক্তিকে সম্ভবত জেলেনস্কির বিশ্বস্ত সহযোগীদের ঘনিষ্ঠ বলয় থেকেই আসতে হবে। কিন্তু সেখানে যোগ্যতায় সত্যিকার অর্থে খাপ খায় এমন কেউ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক ইউক্রেনীয় কূটনীতিক বলেন, ‘কেউই এই কাজ করতে চান না, এভাবে বলাটা অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে। অবশ্যই এই কাজ করতে চান এমন লোক রয়েছেন। তবে সত্যিকার অর্থে যোগ্য কেউ নেই। জেলেনস্কি এই পদটি পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।’

ভুল পথে
ওয়াশিংটনের এই পদটি পূরণ করতে না পারার সমস্যাটি আসলে জেলেনস্কির জন্য একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তার কার্যালয় সাড়া দেয়নি। এক মাস আগে সরকার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের হার কমছে। এই প্রক্রিয়া এখনো অসম্পূর্ণ ও উত্তাল অবস্থায় রয়েছে। সোসিস সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের এক জরিপ অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশের বেশি ইউক্রেনীয় মনে করেন তাদের দেশ ভুল পথে চলছে।

জুলাইয়ে জেলেনস্কি জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইল ফেদোরোভকে বরখাস্ত করায় রাস্তায় বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো ফাঁকা রয়েছে। এই রদবদল জেলেনস্কি কীভাবে তার জ্যেষ্ঠ দল বাছাই করেন এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগীদের সংকীর্ণ বলয়ের বাইরে কতটা যেতে প্রস্তুত—এই বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

লিভিভের বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা এবং ইউক্রেনের ‘এসপ্রেসো টিভি’ চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা মিকোলা কিনিয়াঝিতস্কি বলেন, ‘সরকার কেন বদলাতে হলো তার সঠিক ব্যাখ্যা কেউই ইউক্রেনীয়দের দেননি।’ তার প্রশ্ন, ‘সভিরিদেঙ্কোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল না। পার্লামেন্টে বিদায়ী ভাষণে সভিরিদেঙ্কো করতালিতে সিক্ত হয়েছিলেন। সাংসদরা তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন। তাহলে তার কাজ যদি এত সফল ও প্রশংসিত হয়ে থাকে, তবে তাকে কেন বরখাস্ত করা হলো?’

কঠিন সময়
কিয়েভের জন্য একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে এই রাষ্ট্রদূতের পদ শূন্য হয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার জন্য ইউক্রেনের কাছে ওয়াশিংটন এখনো কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ। যিনিই এই দায়িত্ব নেবেন, তাকে এমন এক ট্রাম্প প্রশাসন সামলাতে হবে, যারা সামরিক সহায়তা এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বারবার তাদের অবস্থান বদলে ফেলেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘পলিটিকোর’ ডাশা বার্নসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টেফানিশিনা স্বীকার করেছিলেন, তিনি এই পদে ‘কূটনৈতিক হুইপ্ল্যাশের’ অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।

কিয়েভ এখন ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির লাইসেন্স দেয়ার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। গত জুনে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিলেও জুলাইয়ে অবস্থান বদলান। জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলার আরেকটি শীতকালের দিকে এগিয়ে যাওয়া ইউক্রেন ইতোমধ্যেই তীব্রতর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। জেলেনস্কি বলেছেন, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর মিত্রদের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে।

একই সময়ে ইঙ্গিত মিলছে যে হোয়াইট হাউস শিগগিরই থমকে থাকা শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করতে পারে। এতে ওয়াশিংটনে এমন একজন রাষ্ট্রদূত প্রয়োজন হবে, যার রাজনৈতিক ওজন থাকবে সেখানে পৌঁছানোর জন্য, যিনি জেলেনস্কির পক্ষে কথা বলতে পারার কর্তৃত্ব রাখবেন এবং এমন এক প্রশাসন সামলাতে দক্ষতা রাখবেন, যেখানে নীতি দ্রুতগতিতে বদলে যায়। এ ছাড়া কংগ্রেসেও তাকে দেন-দরবার করতে হবে।

তাই এই পদটি খালি রাখা কূটনৈতিক নিয়মকানুনের চেয়েও বড় ঝুঁকি বহন করছে। অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা, রসদ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং নতুন কোনো শান্তি প্রচেষ্টার শর্ত নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনে একজন ভারী পদমর্যাদার প্রতিনিধি ছাড়াই থাকতে হতে পারে ইউক্রেনকে।

বিরোধী আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ইউরচিশিন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জেলেনস্কি সম্ভবত কাউকে নিয়োগ দেবেন না। ওই নির্বাচনগুলো না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক পটভূমির সঙ্গে কে সবচেয়ে ভালো মানানসই হবেন তা বিচার করা কঠিন হবে।’

এএম