দাবানলে জ্বলছে স্পেন-ফ্রান্স, দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপদাহ

ফ্রান্সের কোটিনিয়াকে দাবানলকবলিত এলাকায় আগুন নেভানোর কাজ করছেন দমকলকর্মীরা
ফ্রান্সের কোটিনিয়াকে দাবানলকবলিত এলাকায় আগুন নেভানোর কাজ করছেন দমকলকর্মীরা | ছবি: রয়টার্স
0

স্পেন ও ফ্রান্সে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নেভাতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। বুধবার স্পেনের কেন্দ্রীয় গুয়াদালাহারা প্রদেশে ভয়াবহ দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি। কিছু এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে ফিরতে দেয়া হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিরন্ড এলাকায় মঙ্গলবার আগুনের কবলে পড়ে দুই দমকলকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের ট্রাক দাবানলে ঢেকে যায়। তাপদাহ কবলিত এলাকায় বারবিকিউ ব্যবহার এড়িয়ে চলতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, প্রায় প্রতি ১০টি দাবানলের মধ্যে ৯টিই দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে শুরু হয়।

এদিকে পশ্চিম বলকান অঞ্চলে বিপদ এখন তাপদাহ থেকে সরে গিয়ে শিলাবৃষ্টির দিকে মোড় নিয়েছে। উত্তর মেসিডোনিয়া ও পূর্ব কসোভোয় এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

বিশ্বের মধ্যে ইউরোপ সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হওয়া মহাদেশ। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই তাপদাহ, খরা ও দাবানলের তীব্রতা বাড়ছে। একই সঙ্গে হঠাৎ ও ধ্বংসাত্মক ঝড়ের পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মহাদেশটিতে তিনটি অসহনীয় তাপদাহ প্রায় একটির পর একটি বয়ে গেছে। মে-জুন মাসে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবেও এই তীব্র তাপকে দায়ী করা হচ্ছে। রিয়েল-টাইম তথ্য দেয়া রয়টার্স জলবায়ু মনিটরের হিসাবে, পশ্চিম ইউরোপে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে ২২ জুলাইয়ের স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার চেয়ে যা তিন ডিগ্রি বেশি।

স্পেনে দাবানল
স্পেনে চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে গুয়াদালাহারা অঞ্চলে আনুমানিক ৩২ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। ৩৪টি পৌরসভায় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয় এবং ১৪টিতে বন্দিদশার নির্দেশ জারির পর মঙ্গলবার আগুন কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করে।

কাস্তিলা-লা মাঞ্চার ইনফোকাম অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবা জানিয়েছে, পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরে ফেরার অনুমতি দেয়া হয়েছে, তবে অন্যান্য বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের বুধবার শেষ ভাগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইএমইটি জানিয়েছে, মূল ভূখণ্ড ও বেলিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের বেশির ভাগ এলাকায় দাবানলের ঝুঁকি ‘অত্যন্ত বেশি বা চরম মাত্রায়’ রয়েছে। আগামী কয়েক দিনে এই ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুষ্ক বজ্রপাত এবং সাহারা মরুভূমির ধুলার সঙ্গে চলমান তাপদাহ যুক্ত হওয়ায় সবাইকে ‘চরম সতর্কতা অবলম্বনের’ পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এইএমইটির মুখপাত্র রুবেন দেল কাম্পো বলেন, বুধবার তাপদাহ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে এবং দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। বৃহস্পতিবার কিছু এলাকায় তাপমাত্রা সামান্য কমলেও শুষ্ক পশ্চিমা বাতাসের কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে তাপ বাড়তে পারে। এবরো ও গুয়াদালকিভির উপত্যকা, ভালেন্সিয়ার অভ্যন্তরভাগ, মুরসিয়া ও পূর্ব আন্দালুসিয়ার কিছু অংশে সর্বোচ্চ ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হতে পারে।

শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করবে এবং শনিবার স্পেনের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশে তাপমাত্রা স্বাভাবিক বা তার নিচে নেমে আসবে। তবে এই স্বস্তি সাময়িক হতে পারে। রোববার থেকে তাপমাত্রা আবার বাড়তে শুরু করবে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে স্পেনের বেশির ভাগ এলাকায় তীব্র তাপ ফিরে আসতে পারে।

ফ্রান্সে দাবানল
ফ্রান্সে তুলনামূলক কম তাপমাত্রা এবং হালকা বাতাসের সহায়তায় দক্ষিণ-পূর্ব ভার অঞ্চলে দাবানল নেভানোর কাজ কিছুটা এগিয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আগুনে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, কয়েক ডজন বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪০০ জন বাসিন্দাকে ঘর ছাড়তে হয়েছে।

স্থানীয় সময় ভোর ৭টায় (গ্রিনিচমান সময় ০৫০০) হেলিকপ্টার থেকে ভার অঞ্চলের এই দাবানলে পানি ছিটানো আবার শুরু হয়েছে। আগুন এখনো সক্রিয়। ভার অঞ্চলের দমকল বাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার উইলিয়াম ভোগল আরএমসি রেডিওকে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব কঠিন। প্রায় ১ হাজার ১০০ দমকলকর্মী সারা রাত ধরে কাজ করেছেন।’ তিনি বলেন, এখনো আগুন নিয়ন্ত্রণে না এলেও বুধবার বাতাস ‘আরও অনুকূল’ হবে।

প্রিফেক্ট সিমন বাব্র বারবিকিউ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং পৌরসভাগুলোকে গ্রীষ্মকালীন আতশবাজির যেকোনো ঐতিহ্যগত পরিকল্পনা বাতিল করার অনুরোধ জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ওৎ-আল্পসেও আরেকটি দাবানল চলছে।

তাপ ও ঝড়
গ্রিসের রাজধানী এথেন্স এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চল ও মূল ভূখণ্ডে টানা তৃতীয় দিনের মতো তীব্র তাপ চলছে। তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কর্তৃপক্ষ দুপুরে সূর্যের প্রখর তাপের মধ্যে বাইরে কাজ করা নিষিদ্ধ করেছে এবং ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ দিতে নিয়োগকর্তাদের পরামর্শ দিয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়েতে মঙ্গলবার রাতের ঝড়ে ১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের তিনজন গুরুতর আহত। ঝড়ে বলকান দেশটিজুড়ে গাছ উপড়ে পড়েছে, বাড়ির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং কিছু শহর বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন হয়ে পড়েছে।

কসোভোর হাইড্রোমিটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, বুধবার আরও ঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে এবং বজ্রপাত, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বন্যা ও সম্পদহানির আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার বাড়ির ছাদ উড়ে যাওয়া, প্রবল বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টি থেকে গাড়ি রক্ষা করতে বাসিন্দাদের কম্বল দিয়ে গাড়ি ঢেকে রাখার দৃশ্য দেখিয়েছে।

এএম