ইউএসএমসিএ সংশোধনে তৃতীয় দফা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো

মেক্সিকোর মানজানিলো সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার
মেক্সিকোর মানজানিলো সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার | ছবি: রয়টার্স
0

উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি সংশোধনের লক্ষ্যে আজ (মঙ্গলবার, ২১ জুলাই) তৃতীয় দফা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসছেন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। ঠিক সেই সময়ে কানাডার ওপর নতুন করে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কানাডাকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা তিন দিন ধরে চলবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত ১ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসন ছয় বছর পুরোনো আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি ‘ইউএসএমসিএ’-র মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এটিই চুক্তিতে পরিবর্তনের বিষয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনা। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে, যদি না তিনটি দেশ প্রয়োজনীয় উন্নতিতে একমত হয়। ইউএসএমসিএ চুক্তির আওতায় বার্ষিক প্রায় ১.৬ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৬০ হাজার কোটি) ডলারের বাণিজ্য হয়ে থাকে। চুক্তির ত্রিপক্ষীয় কাঠামো এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে শিল্প সংগঠনগুলো ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর নতুন রাষ্ট্রদূত রবার্তো লাজ্জেরি গত শুক্রবার বলেন, চলতি বছরের মধ্যে নতুন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় মেক্সিকো। তিনি বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও একই লক্ষ্যে কাজ করছে। সাবেক এই বিনিয়োগ ব্যাংকার বলেন, ‘যত সময় আমরা হারাচ্ছি, ততই প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, বাজারের অংশ ও বিনিয়োগ হারাচ্ছি। তাই দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো তিন দেশের জন্যই সবচেয়ে ভালো।’

লাজ্জেরি আরও বলেন, উত্তর আমেরিকা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতে আরও বিনিয়োগ আনার যে লক্ষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে, মেক্সিকো তার সঙ্গে একমত। মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া। বর্তমানে মেক্সিকান গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। কানাডার ওপরও একই শুল্ক প্রযোজ্য।

মার্কিন গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও মদের ওপর অটোয়ার পাল্টা শুল্ক এবং কানাডার উচ্চ দুগ্ধ শুল্কের জেরে সোমবার ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এতে দুই দেশের মধ্যকার ফাটল আরও গভীর হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, কানাডার পক্ষ থেকে ছাড় দেয়ার বিষয়ে খুব সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে তার সরকার সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা না নেয়া এবং আলোচনায় ‘বাস্তবসম্মত’ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মেক্সিকোর প্রশংসা করেছেন গ্রিয়ার। তিনি জানান, মেক্সিকো তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করতে, মেধাসম্পদ অধিকার রক্ষা করতে এবং অবৈধভাবে বন উজাড় করা জমিতে উৎপাদিত অ্যাভোকাডো রপ্তানি বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

গাড়ি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কৃষি ও শ্রম খাতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিভিন্ন কারিগরি দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হবে। ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ ইস্যুও গুরুত্ব পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) মনে করে, চীন ও অন্যান্য এশীয় দেশ যেন মেক্সিকো ও কানাডাকে ব্যবহার করে বিশেষ সুবিধায় মার্কিন বাজারে ঢুকতে না পারে, সে জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য সুরক্ষা বাড়ানো প্রয়োজন।

মেক্সিকোর গাড়ির বাজারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই আলোচনায় বিরক্তির কারণ হতে পারে। রয়টার্সের সোমবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পরও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে মেক্সিকোয় চীনা গাড়ির বিক্রি ৩০ শতাংশ বেড়েছে। চীনা ব্র্যান্ডগুলো তাদের বাজারের হিস্যা ১৪ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশে উন্নীত করেছে।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় তাদের উত্তর আমেরিকার অংশীদারেরা যেন অ-আঞ্চলিক পণ্যের ওপর একই ধরনের বাণিজ্য বাধা তৈরি করে। গত মে মাসে মেক্সিকোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ইউএসটিআর প্রস্তাব করেছিল যে, উত্তর আমেরিকায় নির্মিত গাড়ির মূল্যের ৫০ শতাংশ যেন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয়। এটি বর্তমান নিয়ম থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি, যা এই অঞ্চলের সমন্বিত সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত গাড়ি নির্মাতাদের জন্য কঠিন হবে।

গ্রিয়ারের মতে, মেক্সিকোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ, যা ইউএসএমসিএ চুক্তির ভবিষ্যৎ বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই ঘাটতি ২৮ বিলিয়ন বা ১৭ শতাংশ বেড়ে ১৯৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এএম