কখনো কখনো একটি গান শুধু গান থাকে না, সময়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসে আর্তনাদ হয়ে। এরকমই একটি গান হলো-
‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট
ভেঙ্গে ফেল্ কর্ রে লোপাট রক্ত-জমাট
শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!’
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে আজও যখন কোনো প্রতিবাদ রাজপথে গড়ায়, তখন এই সুরই হয়ে ওঠে শিকলে বাঁধা মানুষের স্বপ্ন, অন্ধকারে পথহারা মানুষের মুক্তির মশাল। আর সেই মশাল হাতে যে মানুষটি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি নজরুল।
একদিন সত্যিই কারাগারের অন্ধকারে বন্দি ছিলেন তিনি। বাইরে তখন পরাধীনতার নিশ্বাস, আর ভেতরে এক কবির বুক জুড়ে স্বাধীনতার দুর্নিবার ঢেউ। কলম আর কণ্ঠ থামেনি। এমনকি ক্ষুধার্ত শরীরটিও অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি। কারাগারের অবমাননা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে নজরুল বেছে নিয়েছিলেন অনশন। দিন গড়িয়েছে, শরীর ভেঙেছে, কিন্তু ভাঙেনি তার আত্মার দীপ্তি।
কারণ তার লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়। যে মানুষ কথা বলতে পারে না, যে মানুষ শিকলে বাঁধা, যে মানুষ অন্যায়ের ভারে নত, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল তাদের সবার হয়ে। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-
‘আমি চির বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির’
সেই শির কখনো নত হয়নি। ব্রিটিশের চোখে তিনি ছিলেন বিদ্রোহী, শোষিতের চোখে আশ্রয়, প্রেমিকের কাছে বিরহের সঙ্গী, আর নিপীড়িত মানুষের কাছে এক মুঠো সাহস। ১৯২২ এ প্রকাশিত বিদ্রোহী কবিতা তাকে এনে দিল অভূতপূর্ব খ্যাতি। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, সাম্যবাদী, সর্বহারা শব্দের পর শব্দে তিনি যেন খুলে দিলেন বাংলা সাহিত্যের বন্ধ জানালা। বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।
যে হাতে বিদ্রোহের আগুন, সেই হাতেই ফুটেছে প্রেমের কুসুম। যে কণ্ঠে শিকল ভাঙার বজ্রধ্বনি, সেই কণ্ঠেই বেজেছে গজল, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান, ভক্তিগীতি। তিনি ধর্মের দেয়াল দেখেননি, দেখেছিলেন মানুষ। তাই তাঁর সুরে পাশাপাশি হেঁটেছে মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, প্রেম আর প্রতিবাদ, বেদনা আর উল্লাস। এই কারণেই নজরুল শুধু একজন কবি নন, তিনি বাংলা সংস্কৃতির এক বহমান নদী, যার এক তীরে বিদ্রোহ, অন্য তীরে প্রেম, আর মাঝখানে মনুজ।
১৮৯৯ এর চুরুলিয়ার দরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়া সেই দুখু মিয়া, লেটোর গানের আসর থেকে সৈনিকের জীবন। সেখান থেকে সাংবাদিকতা, কবিতা ও সংগীতের বিস্ময়কর জগৎ, নিজের জীবনকেই যেন বানিয়েছিলেন এক অসমাপ্ত মহাকাব্য। কিন্তু নিয়তি একদিন তার কণ্ঠ কেড়ে নিলো।
১৯৪২ এর পর দীর্ঘ অসুস্থতা ও নীরবতা তার সৃষ্টিশীল জীবনকে স্তব্ধ করে দেয়। কবি কথা বলতে পারেননি কিন্তু তাঁর লেখা কথা বলতে থেকেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ তাকে বুকে টেনে নেয় ১৯৭২ সালে। এই দেশেই তিনি পেলেন জাতীয় কবির মর্যাদা।
পেলেন একুশে পদক, পেলেন সম্মানসূচক ডি.লিট। ভারতও তাকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করে। তারপর ১৯৭৬-এর ১২ ভাদ্র নশ্বর শরীরটি থেমে গেল।
নজরুল চলে গেছেন কিন্তু তার বিদ্রোহ যায়নি। কবির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছে, কিন্তু তার শব্দ এখনো জেগে আছে। শিকল ভাঙার শব্দ হয়ে। মানুষ হয়ে ওঠার স্বপ্ন হয়ে। আর অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়ানোর সাহস হয়ে।





