প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও যৌথ অভিযানে উপকূলে জলদস্যুতা কমেছে

প্রতীকী
প্রতীকী | ছবি: সংগৃহীত
0

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান, টহল জোরদার ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন জলসীমায় জলদস্যুতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যৌথ অভিযান, আধুনিক সামুদ্রিক নজরদারি ও জীবিকায়ন সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করেছে। এতে উপকূলের বন ও জলজ সম্পদনির্ভর মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি হয়েছে।

গত ২৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে জানান, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও জেলেদের সুরক্ষায় পুলিশ, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড (বিসিজি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বন বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে।

‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযানের আওতায় জলদস্যুদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান ও নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, জলদস্যু প্রবণ উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনী, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বিজিবি, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে কোস্টগার্ড।

তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকি, দূরবীক্ষণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪১ জন জিম্মিকে।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৫১ সদস্য কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। গত ৩০ অক্টোবর শুরু হওয়া পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চর, আলোরকোল ও কটকাসহ আশপাশের জলপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

জলদস্যুদের হুমকির মুখে পড়লে জেলে ও ব্যবসায়ীদের কোস্টগার্ডের জরুরি হটলাইন ১৬১১১-এ যোগাযোগের আহ্বান জানান তিনি। এদিকে, এসআরবি-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমেদ বলেন, ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ সদস্য এলিট ফোর্সটির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জেলেদের গভীর সমুদ্র বা বনের দুর্গম এলাকায় একা না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকার দলবদ্ধ বহর নিয়ে চলাচলে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বন বিভাগের সদস্য মোতায়েন থাকবে।

উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক টহল জাহাজ, স্পিডবোট, রাডার, জিপিএস ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপহৃত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত ও মুক্তিপণের লেনদেনের সূত্র অনুসন্ধানেও ড্রোন প্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ সহায়তা করছে।

তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিচ্ছিন্নভাবে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটছে। গত ১২ অক্টোবর সুন্দরবনের শিবসা নদীর আরবনিয়া খাল এলাকায় সম্রাট বাহিনীর অপহৃত চার জেলেকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তিন মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞাকালে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের জেলে শাহাবুদ্দিন ব্যাপারী বলেন, সরকারি এ সহায়তা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমিয়েছে।

শরণখোলা উপজেলার বনজীবী রমজান আলী বলেন, আগে জলদস্যুদের আতঙ্ক নিয়ে তাদের বনে যেতে হতো। গত মৌসুমে তার দলের কয়েকজন সদস্য জিম্মি হওয়ার পর প্রত্যেককে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হয়েছে।

দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে জব্বার মোল্লা বলেন, গত ৩০ অক্টোবর ৪০টি মাছ ধরার নৌকার একটি বহর দুবলার চরে পৌঁছেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) মহাপরিচালক কমডোর (অব.) সৈয়দ মেসবাহ উদ্দিন আহমদ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উপকূলীয় সম্পদ সুরক্ষায় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, জলদস্যুতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই হুমকি নয়, এটি উপকূলীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটন ও বন সংরক্ষণের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

সাবেক এই নৌ-কর্মকর্তা ও গবেষক বলেন, উপকূলে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোপন তথ্যদাতাদের সুরক্ষা, সহজ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।—বাসস

এএইচ