এ লক্ষ্যে আজ (শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠান তিনটি একটি তিন বছর মেয়াদী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির আওতায় তারা যৌথভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য একটি উদ্ভাবনী সরকারি-বেসরকারি পানি সরবরাহ মডেল অনুসন্ধান ও পরীক্ষা করবে, যার শুরু হবে কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ ওয়ার্ডের চাহিদা নিরূপণ ও পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে এটিই এ ধরনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা, যেটি বাংলাদেশের পানি সরবরাহ খাতের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনার সূচনা করেছে।
চলতি বছরের মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (ম্যাক্স ট্যাপওয়াটার)-পরিচালিত একটি সমীক্ষার পর এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলো।
ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপো রেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাবার পানি প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত। ওই দুটি ওয়ার্ডের মাত্র ২০-৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পৌঁছেছে।
সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, দুটি ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা বর্তমানে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৮৫-১১৫টি বেসরকারি ভেন্ডরের কাছ থেকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার করে পানি কেনে, যার জন্য নগদ ব্যয় হয় ২৫ থেকে ৫০ টাকা করে।
এতে আরও দেখা যায় যে, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি অত্যন্ত লবণাক্ত, পরীক্ষায় যার মাত্রা জাতীয় নিরাপদ সীমা ১,০০০ পিপিএম-এর বিপরীতে ৬,০০০ পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশে অবস্থিত নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অফ মিশন এবং বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইয়ানা ভ্যান ডার লিন্ডেনের উপস্থিতিতে র্যাডিসন ব্লু হোটেলে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ু বিষয়ক প্রথম সচিব ইঙ্গে ক্লাসেন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাক্ষী ছিলেন।
বাংলাদেশে অবস্থিত নেদারল্যান্ডস দূতাবাস এই উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে, কিন্তু তারা সমঝোতা স্মারকের স্বাক্ষরকারী পক্ষ নয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান অতিথি মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের জনগণকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের মধ্যকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “একটি সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক সংযোগ নিশ্চিত করার আমাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে এটি পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। সরকার একা সবসময় প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। এনজিওগুলোর রয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের সঙ্গে ব্যাপক সংযোগ, বেসরকারি খাতের আছে অভিজ্ঞতা, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ আর সরকার সহায়তা প্রদান করে। এই তিনটি শক্তিকে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং আমি আনন্দিত যে এই প্রকল্পটি সেই নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের এই পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে, তা চট্টগ্রামের অন্যান্য অংশে এবং অবশেষে সারাদেশে সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস শুধু পানি সরবরাহ নয়, বরং নৌপথ পরিবহন, খাল ব্যবস্থাপনা এবং বৃহত্তর পানি-সম্পর্কিত উন্নয়নেও একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
বিশেষ অতিথি ইয়ানা ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন, বাংলাদেশের প্রতি, বিশেষ করে পানি খাতে, নেদারল্যান্ডসের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি রয়েছে। “এটি আমাদের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, তবে ক্রমশ এটি বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।”
তিনি বলেন: “আমাদের সম্পর্ক বিকশিত হচ্ছে। আমরা সাহায্য ও উন্নয়নের ওপর চিরাচরিত মনোযোগ থেকে সরে এসে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে একটি সমতাভিত্তিক অংশীদারত্ব তৈরির দিকে এগোচ্ছি। এর অর্থ হলো, উন্নয়নমূলক প্রভাবের সঙ্গে টেকসই ব্যবসায়িক মডেল, উদ্ভাবন এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে সমন্বয় করা। আর চট্টগ্রামেই আমরা এটি করতে চাই।”
প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, তিনটি সংস্থার মধ্যে এই অংশীদারত্ব নগর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে – যেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি উদ্ভাবন চট্টগ্রামের জনগণকে নির্ভরযোগ্য ও টেকসইভাবে সেবা প্রদানের জন্য হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে।
ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন অংশীদারসহ সকল পক্ষের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এমন এক রূপান্তরমূলক বাস্তবতা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি পাবে।
ইয়ামিন ফারুক বলেন, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ উন্নত করার জন্য বরিশাল ও খুলনায় বাস্তবায়িত তাদের কিছু পানি সরবরাহ মডেল বন্দর নগরীতে অনুকরণ করার জন্য কাজ করছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জনগণের পক্ষে ইশরাফিল খসরু ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানি সরবরাহের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন।
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত ‘বিল্ডিং ওয়াটার বিজনেস’ (বিডব্লিউবি) কর্মসূচি থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই অংশীদারত্বটি গড়ে উঠেছে। বিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনা জুড়ে ১০৫টিরও বেশি পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে পেশাগতভাবে পরিচালিত ও অর্থের বিনিময়ে দেওয়া পানি-সেবা সফলভাবে পরিচালিত হতে পারে।
এই নতুন সহযোগিতা সেই অভিজ্ঞতাকে একটি ভিন্ন আঙ্গিকে নিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র কমিউনিটি-পরিচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনুকরণ না করে, এই উদ্যোগটি অনুসন্ধান করবে যে কীভাবে সরকারি তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম ওয়াসার সরকারি অবকাঠামো এবং বৃহৎ পানি সরবরাহের সক্ষমতাকে বেসরকারি পরিচালনা ও বাণিজ্যিক দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।





