সাগরে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ সুবিধা থাকায় মেরিটাইম সেক্টরে ঝুঁকছে দেশের মেধাবী তরুণরা। অথচ অ্যাকাডেমিতে প্রবেশের ২ বছর পর ফিকে হয়ে যায় তাদের স্বপ্ন। দেশী পতাকাবাহী জাহাজ কম হওয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বসে থাকতে হয় এক থেকে দুই বছর। এতে চার বছরের অনার্স করতে লেগে যায় ৬-৭ বছর।
ক্যাডেটদের অভিযোগ, এই সুযোগে অনেক এজেন্সি জাহাজে চাকরির নামে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এমনকি প্রশিক্ষণকালীন সময়ে বেতনের একটা অংশ এজেন্সির একাউন্টে পাঠাতে বাধ্য করছে। চাকরি না পেয়ে দরিদ্র পরিবার থেকে আসা ক্যাডেটরা ভুগছে চরম হতাশায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্যাডেট বলেন, ‘এজেন্সিগুলো আমাদেরকে অফার দেয়, ঠিক আছে, কেউ চার লাখ টাকা দিতে পারবা? আসো। চার লাখ টাকা দিলে ওরে নেয়, আর বাকিরা নেয় না। এখন আমার পক্ষে, আমার ফ্যামিলির পক্ষে চার লাখ টাকা তো সম্ভব না।’
অন্য আরেকজন ক্যাডেট বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো ঘটছে টেবিলের নিচের দিকে। কারণ আপনি জানেন, দুর্নীতি কখনো টেবিলের ওপরে বা চোখের সম্মুখে হয় না।’
দেশে সরকারি-বেসরকারি মেরিন ও ফিশারিজ অ্যাকাডেমি এবং তিনটি নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর বের হচ্ছে এক হাজার ক্যাডেট। বিপরীতে ১০৮টি দেশীয় পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ ২ জন করে বছরে মাত্র ২১৬ জন চাকরির সুযোগ পাচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপ শিপিং মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আবু তাহের বলেন, ‘ধরুন ১০৮টি বা ১০টি তাহলে প্রতিটি জাহাজে আপনার ক্যাডেট থাকে ২ জন। দুই ডিপার্টমেন্টে। তো ২ জন করে হলে ২১০ বা ২০ জন। কিন্তু প্রতিবছর বের হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ জন। তাহলে বাকি ক্যাডেটগুলা কী করবে?’
ভিসা জটিলতায় বাংলাদেশী নাবিকদের নিয়োগ নিতে চায় না বিদেশি জাহাজ। ইউরোপ-আমেরিকার ভিসা পায় হাতে গোনা অফিসার। মেরিন হাব সিঙ্গাপুর, দুবাই, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশও ভিসা বন্ধ রেখেছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নাবিকরা এদেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা পেলেও বাংলাদেশী নাবিকদের দেয় না এসব দেশ। এর পেছনে বিভিন্ন বন্দরে ভুয়া সাটিফিকেটধারী নাবিকদের পলায়নকেও দুষছেন খাত সংশ্লিস্টরা ।
আরও পড়ুন:
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের মুখ্য কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেখ মো. জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘তুমি দক্ষ, যোগ্য, সব কিছু। তোমাকে আমি নিয়োগ দিলাম। কিন্তু যেই দেশে নিয়োগ দিব, ওই দেশে তোমার ভিসা সমস্যা হচ্ছে। তখন এটার যে এত ডিলে এবং কমপ্লিকেশন, এগুলো অনেক সময় অনেক শিপ ওনার বলে, আমি এত কমপ্লিকেশন, এত বার্ডেন, খরচ—হোয়াট এভার—এগুলো আমি নিতে চাই না, গো টু দ্য অ্যানাদার কান্ট্রি।’
এতে নাবিকদের বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। সংকট নিরসনে কাউন্সিলর নিয়োগসহ ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার আহবান সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, ‘ইন্ডিয়ান সিফারার এখানে এসে জয়েন করে, ওরা অন-অ্যারাইভাল ভিসা পায়। কিন্তু আমাদের সিফারাররা এখান থেকে যেতে হলে আমাদের ভিসা লাগে এবং সেই ভিসা প্রসেসিং এক মাস থেকে তিন মাস। তো কোনো ওনার, আপনার একটা জাহাজকে বাংলাদেশের একটা সিফারার নেয়ার জন্য এক থেকে তিন মাস জাহাজ বসায় রাখবে না। সরকার ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একটা রেসিপ্রোকাল করে যে না।’
মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে বর্তমানে এ পেশায় কর্মরত আছে ১২ হাজার ৬৯৭ জন নাবিক। চাকুরিতে যোগদানের অপেক্ষায় আছে আরও ৬ হাজার। বর্তমানে নাবিকরা বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ভিসা জটিলতা কাটলে এ খাত থেকে তিন-চার বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব।





