মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরেও কেন থমকে আছে বিচার-ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া?

মাইলস্টোনের সেই বিমান দুর্ঘটনা; হাইকোর্ট
মাইলস্টোনের সেই বিমান দুর্ঘটনা; হাইকোর্ট | ছবি: এখন টিভি
0

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পার হলেও, থমকে আছে আইনি বিচার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া। উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও তা এখনও অপ্রকাশিত।

বছর পেরুলেও কাটেনি উত্তরার মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত। সরকারের গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী-চীনে তৈরি এফটি-সেভেন যুদ্ধবিমানটিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিলো না। মূলত প্রশিক্ষণার্থী পাইলটের উড্ডয়ন অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের চরম নজরদারির অভাবেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। যদিও সরকার এই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো গোপন রেখেছে।

তদন্তে উঠে আসে-উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় পাইলটের ভুল কমান্ডের কারণে বিমানটির গতি ও উচ্চতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া রানওয়ে সংলগ্ন এলাকায় রাজউকের ইমারত বিধি না মেনে ভবন তৈরি করা এবং একটিমাত্র বের হওয়ার পথ থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা এত ভয়াবহ রূপ নেয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘যেখানে মাইলস্টোনটা আছে, সেটা ফ্লাইং জোনের ভেতরে এবং সেখানে এই ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠান বা জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনা হয়েছে। ফলে যখন দুর্ঘটনাটা হলো, তখন অনেক প্রাণহানি হলো। আমাদের অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রাণ হারালো। যদি আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডটা মানতাম, তাহলে অন্তত দুর্ঘটনা হলেও প্রাণহানির সংখ্যাটা কম হতো। পাশাপাশি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের যে জায়গাটা ছিলো, সেটা কিন্তু শুধু মাইলস্টোন নয়, এরকম অনেক ভবন আছে, সেটা সরাসরি রাজউক বা বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উচ্চতার লিমিট ক্রস করেছে।’

এদিকে ট্র্যাজেডির শিকার ভুক্তভোগীদের চীনের ল্যাব থেকে টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট আসার আগেই তড়িঘড়ি করে প্রশাসনিক প্রতিবেদন জমা দেয়া এবং তা প্রকাশ না করা নিয়ে অস্পষ্টতা দেখছেন রিট আবেদনকারী আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিরুল হক তুহিন বলেন, ‘টেকনিক্যাল এক্সপার্ট কমিটি বিমানের অবস্থাসংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়ার কারণে তারা তাদের তদন্ত শেষ করতে পারেনি। তার আগেই কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেখান থেকে তদন্ত প্রতিবেদন এরই মধ্যে জমা দেয়া হয়ে গেছে। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ভিক্টিমরা কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়নি। সরকার তো যেকোনো পরিস্থিতিতেই দায়িত্ববোধ থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। গত অর্থবছরে সম্ভব হয়নি বলে এই অর্থবছরেও সম্ভব হবে না, এরকম তো কোনো নিয়ম নেই।’

একইসাথে বিমান পরিচালনার ঘাটতির পাশাপাশি অনুমোদনহীন বহুতল ভবন পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি তৈরির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি সুপ্রিম কোর্টের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা বলে পার পেয়ে যাওয়ার কোনো স্কোপ নেই। শিশুরা যারা মারা গেলো, তাদের জীবন তো আর ফিরিয়ে দেয়া যাবে না, তাদের জন্য আমরা একটা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছি। সেটা এখন পেন্ডিং আছে। অনেক পরিবার শেষ হয়ে গেছে। অনেকের মনে করেন একটাই ছেলে, সেই পরিবারটা তো শেষ হয়ে গেছে। সেজন্য এটার প্রকৃত বিচার হতে হবে।’

তদন্ত কমিশন ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করলেও চলতি বছরের ৩ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে নিহতদের ২০ লাখ ও আহতদের ৫ লাখ টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। তবে অভিভাবকরা এই ক্ষতিপূরণকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে তা গ্রহণ করেনি।

কাগজ-কলমের তদন্ত আর চিঠিপত্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে, শেষ পর্যন্ত আদালতের পর্যবেক্ষণে এই ট্র্যাজেডির সুনির্দিষ্ট বিচার প্রতিষ্ঠা হয় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

এসএইচ