জাতিসংঘ ভাষণ ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক: কেন থমকে গেছে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং | ছবি: সংগৃহীত
0

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উত্তপ্ত ভাষণ থেকে শুরু করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বৈঠক এক ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেশিশক্তির প্রদর্শন করলেও ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির আসল সীমাবদ্ধতা ও অর্জনের অভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এমন তথ্য ঊঠে এসেছে রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ঘরের ভেতরে ও বাইরে চতুর্মুখী সংকটে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে টানা সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধস নামিয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতায় চীনের উদয় ট্রাম্পের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সীমিত অর্জন
ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের পডিয়ামে দাঁড়িয়ে ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার নজিরবিহীন হুমকি দিয়েছিলেন এবং জয়ী শক্তির দাপট দেখানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসার সময় ট্রাম্পকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও প্রতিরক্ষাত্মক রূপ ধারণ করতে দেখা গেছে। শি জিনপিং যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন, সেখানে মার্কিন অর্থনীতি ইরান যুদ্ধের মাশুল গুনছে।

দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের বহুল আলোচিত এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে দৃশ্যমান একমাত্র অর্জন ছিল বাণিজ্য যুদ্ধের সাময়িক স্থগিতাদেশ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই মাস বৃদ্ধি করা। শি জিনপিং যখন ভেতরে ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার কড়া বার্তা দিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প বেইজিংয়ের বিরল খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরতার কারণে আগের মতো উচ্চ শুল্কের কৌশল থেকে সরে এসে ‘ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের’ ওপর জোর দিয়েছেন।

ইরান যুদ্ধের স্থবিরতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনৈতিক ব্যর্থতা বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও ওয়াশিংটন যৌথভাবে এই যুদ্ধ শুরু করে। সাত মাস ধরে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তেহরানের নতি স্বীকার না করার মনোভাব মার্কিন নীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত অপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

বিশ্বনেতাদের প্রতিরোধ ও মিত্রদের ক্ষোভ
জাতিসংঘ অধিবেশনে বিশ্বনেতারা সরাসরি ট্রাম্পের নাম না নিলেও তার নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জোর যার মুল্লুক তার—এমন ‘জঙ্গল রাজত্বে’ ফিরে যাওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের টহল বা হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সাময়িক শক্তি বা জ্বালানি যুদ্ধবিরতি করানোর মার্কিন প্রচেষ্টাও বিশেষ সাড়া পায়নি।

ইউরেশিয়া গ্রুপের সভাপতি ইয়ান ব্রেমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘এক বছর আগেও খুব কম দেশ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেত। কিন্তু এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়া সরাসরি ট্রাম্পকে ‘না’ বলতে শিখছে।’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে যাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক ইরান থেকে রক্ষা করাসহ বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষায় অগ্রগতি অর্জন করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বিশ্বনেতারা এটি বুঝতে পারছেন যে ট্রাম্পের একক ক্ষমতার দাপট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।

এএম