পশ্চিম তীরের প্রাচীন স্থাপনা ঘিরে ইসরাইলি দখল; বিপন্ন ফিলিস্তিনি ঐতিহ্য

সেবাস্তিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে ইউনেসকো
সেবাস্তিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে ইউনেসকো | ছবি: বিবিসি
0

অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রাচীন সেবাস্তিয়া অঞ্চলে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জলপাই চাষ করে আসছে। কিন্তু এখন সেই জমিতেই তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হতে বসেছে। জমির মালিকদের একজন আবু মুদিফ সম্প্রতি একটি নোটিশ পেয়েছেন। তাতে জানানো হয়েছে, একটি নতুন জাতীয় উদ্যান নির্মাণের জন্য তার প্রায় সাড়ে ৪০০ একর জমি অধিগ্রহণ করছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বিবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা যায়।

সাধারণত এই ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের সামান্য বা কোনো ক্ষতিপূরণই দেয়া হয় না। তবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও অনেকে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তারা মনে করেন, এতে পৈতৃক ভূমি হারানোর বিষয়টিকে বৈধতা দেয়া হবে। আবু মুদিফ বলেন, ‘জমি আমার কাছে শুধু আয়ের উৎস নয়। এটি যেন আমার আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার মতো। জমি ছাড়া নিজেকে আমি কল্পনা করতে পারি না।’

স্থানীয় রেস্তোরাঁ মালিক নাহেদ সাখাও তার প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার আশঙ্কার মুখে রয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরাইলের পরিকল্পনা হল, প্রত্নস্থলটি থেকে ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনায় ইহুদি, রোমান, ক্রুসেডার ও অটোমান আমলের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে। জমির মালিকদের বলা হয়েছে, তারা আর সেখানে চাষ বা কোনো কার্যক্রম চালাতে পারবেন না।

সেবাস্তিয়াকে ইতিমধ্যে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় যুক্ত করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেসকো। ইউনেসকোর মতে, এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় হুমকি হল—পরিকল্পিত ভূমি অধিগ্রহণ এবং ‘সামারিয়া’ জাতীয় উদ্যান নির্মাণের পরিকল্পনা; যা পুরো স্থাপনাটিকে বিভক্ত করে ফেলতে পারে।

গ্রামের মেয়র মোহাম্মদ আজেম বলেন, বাসিন্দারা এখন প্রত্নস্থলের ময়লা পরিষ্কার করতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ এতে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে সমস্যা তৈরি হতে পারে। গত সপ্তাহে ইসরাইল পশ্চিম তীরের প্রত্নস্থলগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ শেকেল বরাদ্দ করেছে।

ইসরাইলি অধিকার সংস্থা ‘এমেক শাভেহ’-এর প্রধান আলন আরাদ বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষায়, ‘ইসরাইল এই স্থানের মালিক নয়। এটি একটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী স্থান। ইতিবাচকভাবে এর উন্নয়ন করতে চাইলে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে।’ ইসরাইলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবাস্তিয়ার প্রবেশপথ গ্রাম ও বর্তমান পার্কিং এলাকা থেকে সরিয়ে অন্যপাশে নিয়ে যাওয়া হবে।

ফিলিস্তিনের পর্যটন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, ইউনেসকোর এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করবে। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার এই সিদ্ধান্তকে ‘পশ্চিম তীরে ঐতিহাসিক ইহুদি সংযোগ ম্লান করে দেয়ার ফিলিস্তিনি প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ভোট ইতিহাস বদলাতে পারে না।’

শুধু সেবাস্তিয়া নয়, জেরুজালেমের কাছে ‘হেরোদিয়াম’ প্রত্নস্থলেও একই পথে হাঁটছে ইসরাইল। খ্রিষ্টপূর্ব যুগে জুডিয়া রাজ্যের শাসক রাজা হেরোদের গড়া প্রাসাদটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নামে সেখানে প্রায় ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে। বসতি পর্যবেক্ষণকারী ইসরাইলি সংগঠন পিস নাউ জানায়, আন্তর্জাতিক আইন ও ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, বসতি স্থাপন বা শুধু ইসরাইলি নাগরিকদের সুবিধার জন্য জমি অধিগ্রহণ নিষিদ্ধ। তবু বসতি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যেই এই অধিগ্রহণ চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।

হেরোদিয়ামের খননকাজের সঙ্গে যুক্ত ইসরাইলি ট্যুর গাইড শমুয়েল ব্রাউনস অবশ্য মনে করেন, এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো রক্ষার দায়িত্ব ইসরাইলেরই। তার ভাষায়, ‘এই ভূমির প্রত্নতত্ত্ব, নিদর্শন ও ইতিহাস রক্ষায় ইসরাইল দায়বদ্ধ।’ তবে বর্তমান ইসরাইল সরকারের কট্টরপন্থিরা এর চেয়েও আরও এগিয়ে যেতে চাইছেন। চলতি বছরের শুরুতে একটি নতুন বিল প্রস্তাব করা হয়। এতে পশ্চিম তীরজুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নামে জমি অধিগ্রহণের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হতো ইসরাইলি ঐতিহ্য মন্ত্রণালয়কে। গত মে মাসে বিলটি সংসদে প্রথম দফায় পাস হলেও নির্বাচন সামনে থাকায় এটি এখন স্থগিত।

আলন আরাদের ভাষায়, ‘এই বিল প্রস্তাব করাটাই প্রমাণ করে, পশ্চিম তীরে প্রত্নতত্ত্বকেই হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এই কৌশলে খননকাজের মাধ্যমে ইতিহাসকে নতুন করে লেখা হয় এবং ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে জমি নিয়ে ইসরাইলিদের বরাদ্দ দেয়া হয়।’ সেবাস্তিয়ার ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা ক্রমেই আশঙ্কা করছেন, পূর্বপুরুষের এই প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের গভীর সংযোগ এভাবেই হারিয়ে যাবে।

এএম