শহর কিংবা গ্রাম—এখনো ছেঁড়া-ফাটা টাকার নোটের ছড়াছড়ি সর্বত্রই। ময়লা ও জোড়াতালি দেয়া নোটে প্রতিদিনই চলে কেনাকাটা ও লেনদেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, নোট যত পুরনো হবে রোগজীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি ততই বাড়বে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি বলেন, ‘যত পুরানো, যত ছেঁড়া-ফাটা তত বেশি ঝুঁকি। কারণ এটার ফলে রোগজীবাণু আমার মুখ দিয়ে এবং যে কালচার রয়েছে হাতে গোনার কালচার, থুথু দিয়ে গোনার কালচার, সে কারণে এটা ঝুঁকি আরও বেশি।’
অন্যদিকে খুচরা না থাকার বিড়ম্বনা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা বেহাত হবার আশঙ্কাও রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী নভেম্বর থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে ডিজিটাল লেনদেন শুরু করতে যাচ্ছে।
নতুন এই ব্যবস্থায় রিকশাচালক, হকার, ডাব বিক্রেতা কিংবা দিনমজুর ব্যক্তিগত কিউআর তৈরি করে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন। তবে প্রান্তিক এই মানুষগুলোর প্রশ্ন, স্মার্টফোন নির্ভর এই সেবা কীভাবে সহজলভ্য হবে?
রিকশাচালকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘টাকাটা আমি নিম ঠিক আছে, কিন্তু আমার তো মোবাইল থাকা লাগবো। আর আমাদেরকে যাত্রী যেই টেকা-পয়সা দেয়, কেউ ছেঁড়া টেকা দেয়, কেউ টেকা দিলে ভাঙতি কইরা দেওন লাগে।’
অ একজন বলেন, ‘যদি সরকার কোনো একটা টিম গঠন কইরা মোড়ে মোড়ে, রাস্তায় রাস্তায় যে আমাদের মতো মানুষদেরকে শিখায়, তাইলে আমাদের সহজ হইবো আরকি।’
যাত্রীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘রিকশার জন্য যদি হয় সে ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি হোক বা ভাঙতি না থাকলে মোস্ট অব দা টাইম যেটা হয় যে ভাঙতিটা থাকে না, সো সে ক্ষেত্রে সুবিধাজনক হবে।’
এদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ভাসমান ও প্রান্তিক বিক্রেতাদেরও ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই এনআইডি ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ব্যক্তিগত রিটারেল হিসাব খোলার সুবিধা রয়েছে। লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা রাখা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। তবে ভাসমান উদ্যোক্তাদের দাবি, এই হিসেব খোলার বিষয়ে প্রচারের অভাব রয়েছে।
ফুটপাতের দোকানিদের মধ্যে একজন বলেন, ‘ফুটপাতে যারা দোকানদারি করে তারাই কিন্তু সবাই কিন্তু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না। এটা কেউ পারবে, কেউ পারবে না।’
আরও পড়ুন:
অন্য একজন বলেন, ‘পার ডে দেখা গেছে কি পরিমাণ বেচাকেনা হয়েছে, কি পরিমাণ এটা একদম খোলামেলা থাকলো, এটা অবশ্যই ভালো হবে।’
ক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘যখন জিনিসটা বুঝতে পারবে তখন সবাই হচ্ছে এই কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন করা শুরু করবে আরকি।’
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনতে চায় তারা। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দেয়ারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রতিটি জনগণই এর মধ্যে আসুক, তারই অংশ হিসেবে এটা এখন শহরের বাইরেও আমরা আমাদের নেটওয়ার্কটাকে বাড়িয়ে নিয়েছি। আর এটার সবচাইতে সুবিধা হচ্ছে, যেহেতু এটার কোনো মেশিন লাগে না, খরচ হয় না, শুধু একটা কিউআর কোডকে আমরা একটা প্রিন্টেড একটা নিয়েই আমরা কাজটা করতে পারি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এরইমধ্যে একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে যে কীভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে জনগণের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে দেয়া যায়। জনগণ তাদের ট্রানজেকশনগুলি ক্যাশলেস করুক। এই ক্যাশলেস ট্রানজেকশন করতে গিয়ে তাদের যে যে ধরনের বাধা আসবে, সেই বাধাগুলি কীভাবে দূর করা যায় সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সরকারের অন্যান্য রেগুলেটরি বডি বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও সেটা অবশ্যই ভেবে দেখবে।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে কিউআর কোড ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং লেনদেনের পরিমাণ তদারকি করা জরুরি। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে আরও বেশি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, আবার অন্যদিকে যারা ব্যবহারকারী তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এই দুটি যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি, আমি মনে করি যে শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এই বাংলা কিউআর কোডের অনেক ব্যবহার হবে।’
প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় ডিজিটাল পেমেন্ট পৌঁছে দিতে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা। পাশাপাশি সহজ করতে হবে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং বাটন ফোনের মাধ্যমে এসএমএসভিত্তিক পেমেন্টের ব্যবস্থাও।
