অগোচরে ডোপ টেস্টে সিল-স্বাক্ষর; জানেনই না চিকিৎসক!

ডোপ টেস্টের রিপোর্ট
ডোপ টেস্টের রিপোর্ট | ছবি: এখন টিভি
0

ডোপ টেস্টের রিপোর্টে চিকিৎসকের স্বাক্ষর ও সিল থাকার কথা। অথচ মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগ থেকে দেয়া একাধিক রিপোর্টে এমন এক চিকিৎসকের নাম, স্বাক্ষর ও সিল পাওয়া গেছে, যিনি বলছেন, এসব রিপোর্টে তিনি কখনোই স্বাক্ষর করেননি।

এমনকি যে বিভাগে ডোপ টেস্ট করা হয়, সেটিও তার বিভাগের কাজ নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসককে না জানিয়েই তার স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এসব রিপোর্ট।

বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা নাজনীন কলেজের অধ্যক্ষের কাছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ৪৭২টি ডোপ টেস্ট হয়েছে বলে প্যাথলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল কুদ্দুসের পাশাপাশি ডা. তাহমিনা নাজনীনের নাম, স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে ডা. তাহমিনা নাজনীন জানিয়েছেন, তিনি এসব রিপোর্টে স্বাক্ষর করেননি। তার প্রকৃত স্বাক্ষরের সঙ্গে রিপোর্টে থাকা স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই।

এদিকে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে চিকিৎসকের স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে মিথ্যা বা জাল দলিল তৈরির ঘটনা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। ঘটনার ধরন ও নথির প্রকৃতি অনুযায়ী ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৮ বা ৪৭১ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে। এসব ধারায় সর্বোচ্চ ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানা গেছে।

ডা. তাহমিনা নাজনীন জানান, তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত। এর আগে তিনি লেকচারার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, প্যাথলজি বিভাগের ডোপ টেস্টের কোনো রিপোর্টে তিনি কখনো স্বাক্ষর করেননি। কারণ, এটি তার বিভাগের কাজ নয়।

ডা. তাহমিনা নাজনীন বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমেই গত বৃহস্পতিবার জানতে পারি, আমাকে না জানিয়ে এমন রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। আজ শনিবার আমি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছি।’

তবে শুধু স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগই নয়, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি ল্যাবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বৈধ নিয়োগপত্র কিংবা আউটসোর্সিংয়ের কাগজপত্র ছাড়াই সাগর ও মিতু নামে দুই ব্যক্তি কাজ করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল কুদ্দুসের নিজস্ব লোক হিসেবে ল্যাবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।

তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়া কী ছিল, কে তাদের কাজে যুক্ত করেছিলেন, কার নির্দেশে তারা দায়িত্ব পালন করতেন এবং তাদের বেতন বা পারিশ্রমিক কে দিতেন, তা জানতে বৃহস্পতিবার কলেজে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। মিতু ও সাগরের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়।

বর্তমানে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে ল্যাব টেকনোলজিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন আজমেরী আক্তার এবং ল্যাব ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আব্দুল কুদ্দুস।

ল্যাবে সাগর ও মিতুর কাজ করার বিষয়ে ল্যাব টেকনোলজিস্ট আজমেরী আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না। আমার উপরে আমার স্যার আছেন, আপনি তার সঙ্গে কথা বলেন।’

ল্যাব ইনচার্জ মো. আব্দুল কুদ্দুসের বক্তব্য জানতে দুই দিন ধরে একাধিকবার তার মোবাইলে কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। কলেজেও তাকে পাওয়া যায়নি।

প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মৃদুল কুমার সাহা বলেন, ‘প্যাথলজি রিপোর্টে চিকিৎসক নিজে স্বাক্ষর করার কথা। তবে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে কোনো রিপোর্ট দেয়ার বিষয়ে আমার জানা নেই।’

সাগর ও মিতুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের নিয়োগ না দিয়ে ল্যাবে কাজ করানোটা ঠিক হয়নি। তবে কার মাধ্যমে তারা এ ল্যাবে কাজের সুযোগ পেয়েছে, তা আমার জানা নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডোপ টেস্টের রিপোর্টে স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা নাজনীন তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এর প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

অধ্যক্ষ বলেন, ‘যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই এর বেশি বলা সম্ভব নয়।’ ল্যাবে সাগর ও মিতু নামে দুই বহিরাগত কীভাবে দীর্ঘদিন কাজ করছিলেন, সে বিষয়েও অধ্যক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমি হঠাৎ একদিন ল্যাবে যেয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো পরিচয় দিতে পারেননি। পরে তাদের ল্যাবে না আসতে বলা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবী শাকিল আহমেদ বলেন, ‘পরিস্থিতি ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করে এ ধরনের ঘটনা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে। দণ্ডবিধির ৪৬৬ ধারায় সরকারি কর্মচারীর তৈরি সার্টিফিকেট বা তার সরকারি দায়িত্বে তৈরি কোনো দলিল জাল করার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করা হলে ৪৭১ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে। আর প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি করা হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ৪৬৮ ধারার বিষয়ও বিবেচনায় আসতে পারে।’

এফএস