দিনে গ্রেপ্তার, রাতে গুলি—আদাবরে পুলিশের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন

সিসিটিভি ফুটেজ ও থানা | ছবি: এখন টিভি
1

দিনের আলোতে গ্রেপ্তার, আর পুলিশের দাবি রাতে অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে হামলার মুখে গুলি। রাজধানীর আদাবরে পুলিশের একটি অভিযানের দুই আসামিকে গুলির এমন বর্ণনা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না পুলিশের দাবি। অসঙ্গতি আছে ঘটনা নিয়ে আদাবর থানার ওসির ব্যাখ্যাতেও। যদিও ডিএমপি বলছে, আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে অভিযান।

রাজধানীর আদাবর শ্যামলী হাউজিংয়ের বাড়িটিতে ২৮ সেপ্টেম্বর হামলা ও ভাঙচুর চালায় একদল দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে গত সোমবার অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় পুলিশের ওপর হামলার দাবি করে ডিএমপি। আত্মরক্ষায় গুলি চালালে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। অভিযানে আহত দুইজনসহ গ্রেপ্তার হয় চারজন।

কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বলছে ভিন্ন কথা। পুলিশ যে মধ্যরাতের অভিযানের দাবি করেছে, চার আসামিকে মূলত গ্রেপ্তার করা হয় সোমবার দুপুর ও সন্ধ্যায়, নবোদয় কাঁচাবাজার এলাকার একটি মাঠ ও নবীনগর হাউজিং এর একটি বাসা থেকে।

স্থানীয়দের একজন বলেন, ‘বাজার থেকে নিয়ে গেছে সোজা। সিসিটিভি ফুটেজও আছে। তিন-চারজন লোক কালো গেঞ্জি পড়া, বুট জুতো পরা, এসে তাকে হাত ধরে টান দিছে।’

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিট। নবীনগরের ৩ নম্বর রোডে সাগরের বাসার সামনে সিএনজি অটোরিকশায় হ্যান্ডকাপ পরা অবস্থায় সাগরকে নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে নিয়ে ভবনের চারতলায় তল্লাশি চালায় পুলিশ।

২৮ তারিখ দুপুরে সাগরকে গ্রেপ্তারের পর সন্ধ্যায় নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির এই বারান্দায় আনা হয়। এরপর তল্লাশি চালানো হয় পুরো বাড়িতে। তল্লাশির পর কোনো কিছু না পেয়ে ফোন করে ডেকে আনা হয় রাশেদকে এবং তারপর রাশেদকে গ্রেপ্তার করে এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। একইভাবে ডাকা হয়েছিল সাকিবকে, তবে সে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আগেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক সামনের সড়ক থেকে তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন সময় সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মাঝামাঝি।

গুলিবিদ্ধ আসামি সাগরের বাবা মো. হান্নান বলেন, ‘তখন সাগর দুইজনকে ফোন করে আনলো। আনার পরে ওদেরে ধরলো। ধরার পরে আমার ঘর তল্লাশি-মল্লাশি করলো। করার পরে পরে সিএনজি আছিলো এখানে নিচে, সিএনজিতে পরে নিয়ে গেছে।’

রাত ৮টা ৮ মিনিটে তাঁদেরও গ্রেপ্তার করে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাত ২ টার দিকে নবদয় হাউজিংয়ে নিয়ে গুলি করা হয় পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেপ্তার আসামিদের।

পরিবারের দাবি, রাত ১১টায় আদাবর থানায় গিয়ে আটক চারজনকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন তারা। কিন্তু হঠাৎ রাত ৩টায় আসে দুজনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর।

অনুসন্ধান বলছে, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সাগর, রাশেদ শাকিব, রাজিবসহ অন্তত ১০ জনের একটি দল নবোদয় হাউজিংসহ আশপাশের এলাকার চিহ্নিত ছিনতাইকারী। কবজিকাটা গ্রুপের সদস্যও তারা দাবি স্থানীয়দের৷ এছাড়া রাজীব ঢাকা উদ্যান এলাকায় বাবু হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি।

কিন্তু বাসা বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ভুল আসামীকে গ্রেফতার দেখিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কথিত অভিযানে হামলার নাটক সাজায় আদাবর থানা পুলিশ দাবি পরিবারের। সুষ্ঠু তদন্তের দাবি স্বজনদের।

সাগরের ভাই মো. মাসুম বলেন, ‘বাড়ি দখলের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা আমরা পাই নাই এখন পর্যন্ত। এখন এটা আমি সরকারের কাছে আমি সুষ্ঠু তদন্ত করে এটা যে অভিযুক্ত আছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেক। যদি এটার ভেতরে আমার ভাইও জড়িত থাকে, তারও সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।’

দিনে দুপুরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলো মধ্যরাতের অভিযানে? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। গোপনে ধারণ করা ঘটনার ব্যাখ্যাতেও কিছুটা অমিল ছিল সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে।

গ্রেপ্তারের ১৩ ঘণ্টা পর আবারও অভিযানের দায়িত্বরত কর্মকর্তা এস আই ত্বরণকে একাধিকবার কল দিলেও ধরেন নি। থানাতে গিয়েও পাওয়া যায়নি তাকে। যদিও পুলিশের অপারেশন ও অপরাধ বিভাগের কমিশনার বলছেন আইনি ভাবেই সেদিন সম্পন্ন করা হয়েছে অভিযান।

কমিশনার বলেন, ‘আমার নলেজে যতটুকু আছে বিষয়গুলি আইনগতভাবে সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে। আপনি এ ব্যাপারে ডিসি তেজগাঁও সাহেবের সঙ্গে একটু কথা বলেন।’

আদাবরের ঘটনা কেবল চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দিনে আটক করে রাতে কথিত অভিযানের নামে আবারও আবারও বন্ধুকযুদ্ধের এমন ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে।

এফএস