বস্তি থেকে রেললাইন, তুরাগে মাদকের বিস্তার; কমছে না অপরাধ

তুরাগে মাদকের বিস্তার
তুরাগে মাদকের বিস্তার | ছবি: এখন টিভি
0

রাজধানীর প্রধান প্রবেশদ্বার খ্যাত টঙ্গীর বস্তি, রেললাইন কিংবা তুরাগ নদীর শান্ত জলরাশি—সবখানেই এখন মাদকের রাজত্ব। এমনকি পুলিশের ওপর পাথর ছুড়ে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে অপরাধী চক্র। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গত ছয় মাসে এক হাজারের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার এবং দফায় দফায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন কমছে না অপরাধ?

রাজধানীর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত টঙ্গীতে প্রকাশ্যে চলছে মাদক কেনাবেচা, আর সন্ধ্যা নামলেই চলে ছিনতাই, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর সহিংসতার মহোৎসব। মাদকের এ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু সিন্ডিকেট, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন কয়েকজন অপ্রতিরোধ্য নারী ডিলার।

মাদক জগতের কথা উঠলেই সবার আগে আসে টঙ্গীর নাম। হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক ও এরশাদনগর বস্তিগুলো অন্যতম বৃহৎ মাদকের হাটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে বসানো হয়েছে সিসিটভি ক্যামেরা।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকার কেরানীরটেক বস্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি রাহুলকে আটক করা হয়। তাকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন হয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথে একদল মাদক কারবারি পুলিশের গতি রোধ করে। তারা রেললাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে পুলিশের সদস্যদের লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে পাথরের আঘাতে কনস্টেবল মাসুদ আহত হন। এ সময় পুলিশের কাছ থেকে হাতকড়াসহ রাহুলকে ছিনিয়ে নিয়ে হামলাকারীরা।

তুরাগ নদীর শান্ত জলের ঢেউয়ে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে জীবনের কোলাহল। তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা হাজী মাজার বস্তি যেন অন্য জগতের নাম—যেখানে নদীর জলের সঙ্গে মিশে আছে অন্ধকার জগতের এক ভয়ংকর বাস্তবাক্রম। তুরাগ নদীকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে এখানে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। বাইরে থেকে দেখলে বস্তির ছোট্ট ও ঘিঞ্জি ঘরগুলোকে সাদামাটা মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মাদকের এক বিশাল সাম্রাজ্য।

আরও পড়ুন

টঙ্গীর এসব বস্তি যেন এক একটি অন্ধকারের দুর্গ। আর এই দুর্গগুলোর একেকটি সিংহাসন দখল করে আছেন কয়েকজন নারী। যাদের একসময়ের মলিন কুঁড়েঘর আজ পরিণত হয়েছে সম্পদে ঘেরা প্রাসাদে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খাতার শীর্ষ আসামি হয়েও কীভাবে তারা গড়ে তুলেছেন এই অবৈধ সাম্রাজ্য?

স্থানীয়রা জানান, একটা সময় এখানে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করা যেত কিন্তু এখন তা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

মাদকের পাশাপাশি টঙ্গীতে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে কিশোর গ্যাং। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশিয় অস্ত্র হাতে মহড়া এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া টঙ্গীর কিশোর গ্যাংগুলো এখন স্থানীয় সাধারণ মানুষের আতঙ্ক। আধিপত্য বিস্তার ও মারামারির পাশাপাশি রাজনৈতিক মিছিলে ব্যবহৃত হয় দুই থেকে তিনশ সদস্যের গ্যাং।

স্থানীয়রা আরও জানান, এই সব কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য আগে মাদক বন্ধ করতে হবে।

২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গীর বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কে ওঠার সিঁড়িতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন সিদ্দিকুর রহমান। নিহতের পরিবার জানায়, সেদিন কেরানীগঞ্জ অফিসে কাজে যোগ দিতে ভোর সাড়ে ছয়টায় বাসা থেকে বের হন সিদ্দিকুর রহমান। টঙ্গীর বাটাগেইট এলাকায় ফ্লাইওভারে উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে ছিনতাইয়ের শিকার হন। বাধা দিলে তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারের একজন বলেন, ‘আদতে কোনো লাভ হয়েছে কিনা জানি। আর আমি এও জানি না আসামী জেলে আছে কিনা।’

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য বলছে , গত ৬ মাসে মাদক ও ছিনতাই সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৫২৬টি । এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ১২১ আসামী। এছাড়া টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে বস্তি ও অপরাধের আখড়ায় প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানের ফলে অনেক টাই কমেছে মাদক ও ছিনতাইয়ের মতো কার্যক্রম।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব।

ঢাবির অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘হয়তো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কিন্তু সে ছাড়া পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু মূল বিষয়টা হলো সঠিক বিচার হয়েছে কিনা।’

তবে প্রশ্ন একটাই—অপরাধের মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনলে কি টঙ্গীর এই অপরাধের করিডর সত্যিকারের নিরাপদ জনপদে রূপ নিতে পারবে?

জেআর