ঢাকার ওপর শিল্পকারখানার চাপ: বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা

ঢাকার শিল্পকারখানার চিত্র
ঢাকার শিল্পকারখানার চিত্র | ছবি: এখন টিভি
0

স্বপ্নের শহর ঢাকায় শিল্প-কারখানার ঘনত্বের পাশাপাশি বাড়ছে জনগণের চাপ। আবাসিক এলাকার পাশে গড়ে ওঠা এসব কারখানা থেকে তৈরি হচ্ছে শব্দ, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ। বাড়ছে যানজট, অগ্নিঝুঁকিসহ নানা সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ঢাকার শিল্প-কারখানাগুলোকে ধাপে ধাপে রাজধানীর বাইরে উপযুক্ত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন ঢাকার ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে শিল্পায়নও আরও পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব হবে।

গার্মেন্টসের চাকরি করে ভবিষ্যতে কিছু করা সম্ভব নয়। এখানে কাজের চাপ অনেক বেশি। স্বামী স্ত্রী দুইজন মিলে চাকরি করলে কিছুটা থাকে, একজনের আয়ে কিছুই থাকে না।# আর ঢাকায় থাকা-খাওয়া সব মিলে যা ইনকাম করি তাই খরচ হয়ে যায়। গ্রামে খাওয়া-দাওয়া বাড়ি ভাড়া বা বাচ্চাকাচ্চা লালন-পালনের ক্ষেত্রে খরচ অনেক কম হবে আই করব তা থেকে যাবে। এটা করে ফিউচার প্ল্যানিং নেয়ার সম্ভাবনা নেই, আজ যদি ও অসুস্থ হয় তাহলে অন্যের কাছে হাত পাতা ছাড়া কোন উপায় নেই। এগুলো এলাকাভিত্তিক বা জেলাভিত্তিক হলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো।

সাথী ও নাজমুলের ছোট্ট পরিবার, থাকেন পূর্বাচলে দুই রুমের ভাড়া বাসায়। সাবলেট থাকেন ফুয়াদ ও শামীমা দম্পতি। আর, ডাইনিংয়ের মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমান আরেকজন।

এরা সবাই কাজ করেন গার্মেন্টসে। স্বল্প আয়ে বাধ্য হয়ে ছোট্ট বাসায় থাকেন ২/৩টি পরিবার। এমন অবস্থা রাজধানীর বিভিন্ন পোশাক কারখানার কাজ করা পরিবারগুলোর। তাদের দাবি, এই বেতনে কোনো রকমে চলে সংসার।

বুড়িগঙ্গার তীরে এই শহরের আয়তন প্রায় ১৪৬৪ বর্গ কিলোমিটার। যেখানে নামে-বেনামে বিপুল সংখ্যক কারখানা চালানো হয়- যার সঠিক হিসাব শুধু সরকার কেন. কোনো সংস্থার কাছেই নেই। সরকারি-বেসরকারি তথ্যমতে, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে শিল্পকারখানা রয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭৫ থেকে ৭০ হাজারের বেশি। যেখানে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তথ্য বলছে, দেশে মোট তৈরি পোশাক কারখানা প্রায় ৪ হাজার। যার মধ্যে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার নিবন্ধিত ও রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসই গড়ে উঠেছে ঢাকা ও আশেপাশের শিল্পাঞ্চলে। আর এসব কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৩৮ লাখ শ্রমিক।

বিবিএস ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, শুধু পোশাক খাত নয়, ঢাকাজুড়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায় জড়িত ২০ থেকে ২৫ লাখের মতো, পরিবহন খাতে জড়িত ১৫ থেকে ১৮ লাখ মানুষ, সেবাখাতে রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মানুষ। আর, প্রায় ২ কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন প্রবেশ করছেন আরও দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ।

শিল্প-কারখানা ঘিরে ক্রমেই চাপ বাড়ছে রাজধানীতে। আর গ্রামে কৃষিভিত্তিক কাজে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকট। গ্রামাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও মজুরি। ফলে, মানুষ ছুটছে ঢাকার দিকে। এমন পরিস্থিতি ঢাকাকে করে তুলেছে বসবাসের অযোগ্য।

সমাধান কি? নগরবিদদের মতে, সম্ভাবনাময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসসহ সকল সুবিধা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে। তাহলেই, ঢাকা থেকে শিল্পকারখানার চাপ কমবে। ঢাকা ফিরবে সবুজ তিলোত্তমায়।

ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় অবৈধ শিল্পায়নকে একদম স্ট্রিক্টলি বন্ধ করতে হবে। তখনই তো উদ্যোক্তারা, যারা উদ্যোক্তা, এন্টারপ্রেনার, তারা ভাববেন যে, আমি যদি শিল্প করতে চাই, আমাকে অন্য যেসব জায়গায় ডেজিগনেটেড শিল্প জোন, সেখানে যেতে হবে। তাহলে সেসব এলাকাতে ঢাকার বাইরে আছে, অন্যান্য রিজিয়নাল এলাকাতে আছে, ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার, জেলা হেডকোয়ার্টারে আছে। সেখানে সরকারকে যেটা করতে হবে— বিদ্যুতের কানেকশন, আমাদের গ্যাসের কানেকশন এবং আমাদের সেসব এলাকার একটা এনভায়রনমেন্ট, যে এনভায়রনমেন্টটা ইনক্লুডিং ট্যাক্স সাবসিডি; যে সেখানে যদি কেউ শিল্পকারখানা করে, তাকে ট্যাক্সের ক্ষেত্রে রেয়াত দেয়া হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজধানীর শিল্প-কারখানাগুলো বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। অন্যদিকে, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরের আঞ্চলিক হাবগুলোতে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমবে। দেশের বাজারে পণ্যের দাম কমবে।

পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, আমি যদি শিল্প-কলকারখানাগুলোকে যদি আমি বন্দরকেন্দ্রিক যদি আমি সেটআপ করি, তাহলে কিন্তু আমার শিল্প উৎপাদনের ব্যয় কিন্তু অনেক কমে যায়। এতে করে আমার উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে এবং মূল্যস্ফীতিও কিন্তু অনেক কমে যাবে। সুতরাং আপনার সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে যে আপনার ডিসেন্ট্রালাইজেশন। একটা রাষ্ট্রে যখন ডিসেন্ট্রালাইজেশন হয়, সেই রাষ্ট্রের যে ইকোনমিক গ্রোথ, সেই ইকোনমিক গ্রোথের সাথে সবাই অংশীদার হয়।

এজন্য, ঢাকার উপর চাপ কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা। এবং তা যথাযথ বাস্তবায়নে নিতে হবে উপযুক্ত কর্মসূচি।

গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কিন্তু আমরা প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে আসছি, কিন্তু এটা ঠিকভাবে হচ্ছে না। এর জন্য একদিকে যেমনভাবে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার; ঠিক তেমনিভাবে সেটা বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার।

ঢাকা দক্ষিণে প্রশাসক বললেন, বৃহৎ পরিসরে না হলেও এ বিষয়ে সরকার কিছু কিছু উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। তবে, ঢাকাকে বাঁচাতে সচেতনতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, পুরান ঢাকায়, বিশেষ করে লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর— এই সমস্ত এলাকাগুলোতে যেগুলোতে আছে। এখানে আরও ছিল যে কিছু কেমিক্যালের ফ্যাক্টরি ছিল, এগুলো কিন্তু অলরেডি সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমরা তাদের কোনো লাইসেন্স দিচ্ছি না। ওদেরকে আলাদা জায়গা দেওয়া হয়েছে।

রক্ত, ঘাম, আর অশ্রুর দামে কেনা এই শহর এখন ধারণ করেছে বিবর্ণ রং। বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধে ভরা কেশকালো পানিই যেন তার চিহ্ন। শহরের সংকীর্ণতার ফাঁকে একদিকে উঁচু উঁচু ভবন, অন্যদিকে রাক্ষসী থাবায় একই সাথে বেড়ে উঠছে কারখানা বা ফ্যাক্টরির বিশাল কর্মযজ্ঞ।ফলে, এই শহরকে বাঁচাতে দরকার সরকারের সমন্বিত উদ্যেগ।

ইএ