প্রতিদিনের চেনা ভোর, নদীর জলে জীবন খোঁজে মানুষ। এই চিরচেনা প্রবাহের মাঝেই হঠাৎ থমকে গেছে একটি জীবন।
ঘটনা গত ১০ এপ্রিলের। এরপর ঋতু বদলালো —তবুও মিলল না উত্তর। মিরাজ শেখ—নদীর ঢেউয়ের মতো যিনি হারিয়ে গেলেন কোনো এক অদৃশ্যের টানে। তিনি কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন ? নাকি তাকে কেড়ে নিয়েছে কোনো অন্ধকার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মোংলার জয়মনি ঘোলের দিকে যাত্রা।
প্রথম গন্তব্য মিরাজ শেখের বাড়ি। তবে সেখানে গিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তালা ঝুলছে। স্থানীয়রা জানান, মোটরসাইকেল চালিয়ে করা আয় রোজগারে সংসার চলতো মিরাজ শেখের। মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যেতেন সুন্দরবনে। ঘটনার পর থেকে মাঝেমধ্যে নিজের বাড়িতে আসেন মিরাজের স্ত্রী। কারণ এখন তাকে থাকতে হচ্ছে পাশে বাপের ভিটায়।
স্থানীয়রা জানান, কোস্টগার্ড এমনি এমনি কাউকে ধরে না। কোস্টগার্ড এ পর্যন্ত শুধু শুধু কারো কোনো ক্ষতি করে নি।
এরপরের যাত্রা মিরাজের শ্বশুর বাড়ির দিকে। পথেই পেয়ে যাই মিরাজের শ্বশুরকে।
মিরাজের শ্বশুর বলেন, আমি শোনার পর সেখানে গিয়ে দেখেছি তাকে কোস্টগার্ড নিয়ে গেছে পল্টন নিয়ে গেছে। শুনেছি যে দুইজন কোস্টগার্ড এনেছে যে তারা সেই সময় সিভিলে ছিলো। সেই সময় পোশাকধারী ছিলো না।
মিরাজকে কোস্ট গার্ড ধরে নিয়ে গেছে—এমন দাবির পক্ষে বড় ভিত্তি ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে মিরাজের পরিবারের দাবির সত্যতা মেলেনি।
মুদি দোকানি আল-আমিন বলেন, আট-দশদিন পর তারা আমার দোকানে গেছে। আমার দোকানে বসে এই যে ভিডিওটা নিয়ে আসছে। আমাকে আগেই বলে নিয়েছে এইভাবে এইভাবে তুমি বলবে। আমি তো হিসাব করেছি সরল মনে যে এই কথাটা যদি বলি আবার চিন্তা করলাম তাদের মত না বলি, তাহলে পরবর্তীতে দোকানদারি না করতে দিলো বা এখান থেকে আমাকে সরিয়ে দিলো।
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম আটকের সময় উপস্থিত থাকার দাবি করলেও, প্রযুক্তি বলছে ঘটনার সময় তিনি যশোরে অবস্থান করছিলেন!
মিরাজের পরিবারের দাবি, সন্ধ্যার আগেই তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বলছে, মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার দিন সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটেও একটি ফোনকল করেছিলেন! কে সেই ব্যক্তি? সূত্র ধরে সামনে আসে সুন্দরবনের একসময়ের আলোচিত নাম— ডাকাত ছোট সুমন।
ডাকাত ছোট সুমন বলেন, টাকা-পয়সা কালেকশন করতাম বাজারঘাট দিয়ে। এইতো অস্ত্রগুলো মনে করেন ওর কাছে দিয়ে যেতো, ওইগুলো পৌঁছে দিয়ে যেতো আমার এখানে, সুন্দরবনে।
সুমনের কথার সূত্র ধরে যেতে চাই সেই ব্যক্তির কাছে যে সুমনকে টাকা দিয়েছিলো। স্থানীয় সেই ব্যক্তি বিষয়টি স্বীকার করে জানান, জেলেদের কাছ থেকে ডাকাতির টাকা মিরাজের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো। যেটি ডাকাত সুমনের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিলো।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান, মিরাজের বাবা এক সময় ডাকাতি করেছেন, গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। বাবার পথ ধরে তারও ডাকাত দলের সাথে যোগাযোগ ছিলো।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি সে ইয়াবা খেতো। আগে তো ওর বাবা যখন ডাকাতি করতো, ও তো অনেক লুকিয়ে ছিলো। ও তো ওর বাবার সোর্স ছিলো তখন শুনছি। ওকে তখন একবার মনে হয় অ্যারেস্টও করা হয়েছিলো সম্ভবত।
সাবেক মেয়র ও স্থানীয় বিএনপি নেতা জানান, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মিরাজের পরিবারকে ব্যবহার করছে একটি মহল ।
মোংলা পৌর বিএনপির সভাপতি জুলফিকার আলী বলেন, যে সরকার আসছে, এর পর থেকে তো এই ধরনের ঘটনা হওয়ার কথাও না, আর হয়ও নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই ঘটনায় মিরাজের মা নিখোঁজ হওয়ার ১৩ দিন পর মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। বর্তমানে সেটির তদন্ত চলছে।
মোংলা থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, তদন্তের টেকনিক আছে, তা অ্যাপ্লাই করে আমরা মিরাজের অনুসন্ধান করছি। কিন্তু বলার মতো এখন পর্যন্ত তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। মিরাজের দুটো সিম ব্যবহার করতো, সেই দুটো সিমের আমরা যে এনালাইসিস করে দেখেছি—সেটা তার বাড়ির আশেপাশে থাকা অবস্থায় যে বন্ধ হয়েছে, অদ্যাবধি বন্ধ।
কোস্ট গার্ড পূর্বজোনের স্টাফ অফিসার লেফট্যানেন্ট কমান্ডার সাইফুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়। অনুসন্ধানে কোস্টগার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার যেখানে গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচার করছে, সেখানে কোনো বাহিনী নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটানোর সাহস পাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, কেউ কোনো কিছু ক্লেইম করলেই সেটাকে আমরা সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে এগোনো উচিত বলে আমি মনে করি না।"
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়া এখন কেবল একটি নিছক হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়; এটি এক গোলকধাঁধা—যেখানে অভিযোগের মেঘে ঢাকা পড়েছে প্রমাণের আকাশ।





