অবৈধ ব্যাটারি রিকশার দাপটে সংকটে ঐতিহ্য, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ চুরি

রাস্তা দখল করে রেখেছে ব্যাটারি রিকশা, পড়ে আছে প্যাডেল রিকশা
রাস্তা দখল করে রেখেছে ব্যাটারি রিকশা, পড়ে আছে প্যাডেল রিকশা | ছবি: এখন টিভি
0

অবৈধ ব্যাটারি রিকশার দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে প্যাডেল রিকশা। একইসঙ্গে বাড়ছে সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকি, দুর্ঘটনা এবং বিদ্যুৎ চুরির মতো ঘটনা। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া রিকশা আর্টও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সংকট আরও গভীর হবে।

জরাজীর্ণ, রিকশাগুলোর দিকে তাকিয়ে নির্বাক হাটা মো. মঞ্জুর। একটা সময় তেজগাঁও এলাকায় ছিলেন ১০০ রিকশার মালিক। তবে অটোরিকশার দাপটে এখন একঘরে তার প্যাডেল চালিত রিকশার গ্যারেজ। চালক সংকটে পড়ে আছে শত রিকশা, আয় না থাকায় বেঁচে থাকাও এখন কঠিন হয়েছে এক সময়ের শতাধিক রিকশা এই মালিকের।

মো. মঞ্জুর বলেন, ‘এই রিকশা অহন আমগোর গলার কাটা হইয়া দাঁড়াইছে। রিকশা চলে না, আমরাও দুইটা ডাল-ভাত খাইতে পারি না। এইডা নিয়া খুব চিন্তিত আছি আজ দুই-তিন বছর ধইরা। এই রাস্তার মধ্যে গাড়ি থুইয়া কী করমু? অবস্থা খুব খারাপ।’

শুধু এই মঞ্জুরই নন রাজধানীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অন্তত তিন হাজার রিকশা গ্যারেজ মালিক হারিয়েছে অস্তিত্ব৷ দেউলিয়া হয়েছেন বেশিরভাগ। কেউ কেউ পায়ে চালিত রিকশার গ্যারেজ রূপান্তর করেছেন যান্ত্রিক রিকশায়৷ এতে পেশা হারিয়েছেন প্রকৃত রিকশাচালকরা। আর যারা টিকে আছেন তাদের জন্য সড়ক যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র ।

এই যেমন জামালপুরের দুদু মিয়া। ২৭ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালান তিনি। চোখের সামনেই উপার্জনের পথ দখল হয়েছে অবৈধ বাহনে।

দুদু মিয়া বলেন, ‘পোলাপানের লেখাপড়া করাইতে পারি না। খুব দুর্যোগ মোকাবিলা যাইতাছে দিন। অটোগাড়ি বানানির পরে আমগোর বাংলা গাড়িতে কোনো যাত্রী ওঠে না। কীভাবে সংসার চালাবো আর কীভাবে দিন যাইবো আমার? পোলাপান নিয়া কই যামু, কী করমু? কোনো দিশা পাই না ‘

শুধু চালকই নন, প্যাডেল চালিত রিকশা যতই গতি হারাচ্ছে ততই এখানে জড়িয়ে থাকা মানুষ পেশা হারাচ্ছে।

বয়স্ক একজন বিকশাচালক বলেন, ‘না পারি ছেলেমেয়েরে লেখাপড়া শিখাইতে, না পারি আমরা চলতে। এই পরিস্থিতিতে আমরা দিন যাপন করতেছি।’

অটোরিকশার কারণে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, হুমকি সৃষ্টি হয়েছে জনজীবনে। হারানোর পথে শত বছরের ঐতিহ্য, এমনকি রিকশার সঙ্গে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, রিকশা আর্টকেও বিলুপ্তের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের পরিচালক ড. তপন কুমার বাগচী বলেন, ‘এই যান্ত্রিক রিকশাগুলোকে যখন বাজারে-পথে ছাড়ার অনুমতি হলো, তারা তখন আর এই পেছনের আর্টটা, সেটি তাদের উপযুক্ত, মানে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না। কিন্তু রিকশাকেই বাঁচিয়ে রাখা উচিত। আর রিকশাকে বাঁচিয়ে রাখলে আমার পেইন্টিং বাঁচবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈজ্ঞানিক একটি বাহন গিলে খেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাচীন এক বাহনকে। সৃষ্টি করেছে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এই অটোরিকশা যেভাবে পঙ্গপালের মতো সড়কে নেমেছে, আমার ধারণা এখানে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে। তার সঙ্গে এই যে চুরি করে বিদ্যুৎ, সেখানে একটা বিশাল রাজস্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে। এই ক্ষতিগুলো যদি আমরা বিবেচনায় নেই, জীবন-জীবিকার সঙ্গে আসলে অর্থনৈতিক ক্ষতি সেটা যদি আমি কস্ট-বেনিফিট এনালাইসিস করি, এটা আমি স্বল্পমেয়াদী এখান থেকে আমি একটা সুবিধা হয়তোবা দেখছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এটা আমাদের একটা বিশাল আমি মনে করি মাথাব্যথা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডায়ালগের তথ্য বলছে, দেশে ১০ লাখ প্যাডেল চালিত রিকশার বিপরীতে ব্যাঙের মতো জন্ম নিয়েছে ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশা। এসব অবৈধ বাহন যেমন তৈরি করেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বাড়িয়েছে দুর্ঘটনা ও সড়কে মৃত্যুর হার।

এসএস