স্বাস্থ্য

নিজের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছেন অনেক নারী

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষ সকলেই। কিন্তু এখনও মাসিক বা ঋতুস্রাব শব্দটি শুনলে অস্বস্তি বোধ করেন বেশীরভাগ নারী। সেই সাথে মাসিক নিয়ে সমাজে পুরুষের টিপ্পনী তো রয়েছেই। প্রাকৃতিক এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা অথবা জনসচেতনতা তৈরি না হওয়ায় নিজের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছেন অনেক নারী।

ঘরে-বাইরে নারীদের ছুটতে হচ্ছে নিয়মিত। প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে থাকা তো চলবেই না, বরং এগিয়ে যাওয়া চাই। কারও আছে পরিবারের দায়িত্ব, আবার কারও কাঁধে পড়াশুনার চাপ। দেখা যায় কারও আবার অফিসের কাজ থাকে। সব সামলিয়েই পথ চলা। কিন্তু এই স্বাভাবিক পথ চলাটাই নারীদের জন্য কতটা কঠিন হয়ে ওঠে মাসিক ঋতুস্রাবের সময়?

বেসরকারি চাকুরিজীবী আরজুমান হোসেন অন্ত। দৈনিক ৮ ঘন্টা অফিসসহ বিভিন্ন কাজে বাসার বাইরে তাকে থাকতে হয় গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। কিন্তু প্রতিমাসেই পিরিয়ড বা মাসিক ঋতুস্রাবের সময়টায় শারীরিক বা মানসিক জটিলতায় তার দায়িত্বগুলো রূপ নেয় বোঝায়। কাউকে যেনো তিনি বুঝতে পারেন না, কেউ যেনো তাকেও চিনতে পারেন না।

অন্ত বলেন, 'আমার কাছে মনে হয় পিরিয়ডের সময়কে একটু আলাদাভাবে দেখা উচিত, তা অধিকাংশ মানুষই চিন্তা করতে পারে না। আমার পরিবর্তে একজন কাজ করবে, সেই পরিবেশটা এখনও আমাদের নেই।'

এমন চিত্র শুধু অন্তর একার নয় ঘরে-বাইরে থাকা প্রায় প্রতিটি নারীর। পিরিয়ডের সময়টায় নারীর পাশে থাকার মতো পরিবেশ কি আদৌ তৈরী করা গেছে?

একজন নারী বলেন, 'ন্যাচারাল যে জিনিসগুলো সেগুলোকে ন্যাচারালভাবেই দেখা উচিত। কিন্তু আমি একজন মেয়ে হিসেবে দেখি আমাদের যখন পিরিয়ড হয়, তখন আমরা যে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে যাবো আমরা মেয়েরা সে সাহসটা পাই না।'

মাসিক বা পিরিয়ড আমাদের সমাজে এমনই একটি ট্যাবু যে এই বিষয় নিয়ে যখন প্রতিবেদন তৈরী করা হয়, তখন অনেক নারীই পিরিয়ডের জটিলতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর ক্যামেরার সামনে দিতে রাজি হন নি। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ কেউ এগিয়ে এসেছেন। এই ট্যাবুর আরও একটি উদাহরণ হলো, এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশের অধিকাংশ নারী নিজের স্যানিটারি ন্যাপকিন নিজে কিনেন না শুধুমাত্র লোকলজ্জার ভয়ে। যদি বিক্রেতা কিছু মনে করেন অথবা পাশে থাকা ক্রেতা বাঁকা চোখে তাকায়। কিন্তু অন্য যেকোনো অসুখে কি ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনতে আমরা সংকোচ বোধ করি? উত্তর যদি না হয় তাহলে এত সংকোচ কেনো?

শুধু স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার ক্ষেত্রেই নয় পিরিয়ড চলাকালীন অনেক কুসংস্কারে এখনও বিশ্বাস করেন নারীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সচেতনতার অভাবে দেশের ৭১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী এখনও পিরিয়ডের সময় ডিসপোজেবল প্যাড ব্যবহার করেন না। প্যাডের পরিবর্তে পুরোনো আর অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহারে নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।

জরিপে আরও বলা হয়, প্রায় ৫০ শতাংশ কিশোরী স্যানিটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে। নিজের অজান্তেই তারা শরীরের ভেতরে বয়ে বেড়ান বিভিন্ন জটিল রোগ।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গাইনী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রওনক জাহান বলেন, 'অনেক নারীই এই সময়টাকে জীবনের একটা খুবই কষ্টকর অধ্যায় হিসেবে দেখেন। এবং সেজন্যই এটা থেকে যে মানসিক কষ্ট তিনি নেন, সেখান থেকেই শারিরীক কষ্টটা প্রকট হয়ে ওঠেন। অনেকে ন্যাপকিন ব্যবহার করার নিয়মটা জানেন না। ৬ ঘণ্টা পরপর ন্যাপকিনটা পরিবর্তন করতে হবে এটা অনেকেই জানেন না।'

তবে গ্রাম কিংবা শহরে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে এর মূল্য হাতের নাগালে না থাকা একটি বড় কারণ বলে মনে করেন সামাজিক উন্নয়ন কর্মীরা। এছাড়াও তারা বলেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে যদি দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন না করা যায় পিরিয়ড নিয়ে নারীদের সংকোচ ভাঙবে না।

ব্রাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি আরবানের এরিয়া ম্যানেজার নাজনীন আক্তার বলেন, 'স্যানিটারি ন্যাপকিনের দামটা বেশি। আমরা যদি এক মসেরটা কিনতে যাই তাহলে আমাকে ১০০ টাকার ওপরে কিনতে হবে। এটা আসলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

দেশের ৩৬ শতাংশ কিশোরী পিরিয়ড না হওয়া পর্যন্ত এই সম্পর্কে জানেন না। অর্থাৎ পরিবার থেকে তাদের দেয়া হয় না কোনো সুস্পষ্ট ধারণা। কিন্তু কিশোরীকাল থেকেই এই অস্বস্তি এবং অজ্ঞতা ভেঙে যত্ন নিতে হবে মাসিক স্বাস্থ্যবিধির।

এমএসআরএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর