দেশে এখন

যে জীবন কেবল হুইলচেয়ারেই বন্দি

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর বেশিরভাগই ঘরবন্দি জীবন কাটিয়ে থাকেন। দেশজুড়ে তো বটেই রাজধানীতেও কাজের প্রয়োজনে বাইরে বেরুলে আতঙ্কে থাকেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় তাদের জীবনের গণ্ডি হয়ে পড়ে ছোট। গবেষণা বলছে, দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী।

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী আকাশনীলা বলেন, 'বাংলাদেশ কি সবার জন্য? বাংলাদেশ আমার জন্য নয়! আমি চাইলেই কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারি না। যেখানেই যায় একটা বাধা সিঁড়ি আছে কিন্তু র‍্যাম্প নেই। আমার পৃথিবীটা মূলত আমার বাসা কেন্দ্রিক। না চাইতেও আমি বন্দি জীবন যাপন করছি।'

দেশ কাকে কতটুকু দিয়েছে এই হিসেব নিকাশে বেশ পিছিয়ে আকাশনীলা।

জীবনের প্রতিটা দুয়ারেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হুইলচেয়ার। স্কুল কলেজের দরজা ডিঙিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকা যায়নি। ঈদ কিংবা উৎসবে পছন্দের কাপড় কিনতেও কোনোদিন যেতে পারেনি শপিংমলে। এসব বাদেও, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কিংবা পুলিশ স্টেশন কোথাও যাওয়া সহজ নয় তার জন্য।

আকাশনীলা বলেন, 'চিকিৎসা নিতে যাবো, কোনো ব্যাংকে যাবো কিন্তু সেটা নিতে পারছি না।'

তার মা বলেন, 'মা হিসেবে আমার স্বপ্ন আমার সন্তান স্কুলে যাবে ও মেধাবী কিন্তু আমি কোনো স্কুলে ওকে দিকে পারছি না। কারণ কোনো স্কুলেই হুইলচেয়ারের জন্য র‍্যাম্প নেই। বিধিমালা অনুযায়ী কাঠামো তৈরি করা হয় ও রাষ্ট্র কাজ করে তাহলে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।'

আজ আমরা যাওয়ার চেষ্টা করতে চাই যেখানে যাওয়া যায় না আকাশনীলার।

হুইলচেয়ারে এক ফুট ওঠার জন্য দরকার ১২ ফুট লম্বা র‍্যাম্প। সে হিসেবে শপিংমলে ৬ ফুট উচ্চতার জন্য প্রয়োজন ৭২ ফুট লম্বা র‍্যাম্প। কিন্তু মাত্র ১৪ ফুট, যা দিয়ে কোনোভাবেই একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর একা ওঠা সম্ভব না। অন্যান্য দেশের সব ভবনে এই নিয়ম মানা হলেও আমাদের দেশে যার সংখ্যা খুবই অল্প।

চেষ্টা ছিল শপিংমলে ঢোকার। তবে প্রবেশের পর্যন্তই যাওয়া গেল, ভেতরে ঢুকতে নেই দরকারি র‍্যাম্প বা লিফট সুবিধা।

বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে হাঁটার ক্ষমতা হারান চিবল সাংমা। এখন হুইলচেয়ারকে সঙ্গী করে এ শহরে নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রবল চেষ্টা করছেন এই ব্যাংকার। কিন্তু পারছেন কতটা?

চিবল সাংমা বলেন, 'আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দুই ধরনের পরিবেশগত ও আচরণগত প্রতিবন্ধকতা পড়তে হয়। এখানে রাস্তার তেমন ভালো না হুইল চেয়ারে চলাচলের জন্য ততটা উপযোগী না। এখন মেট্রোতে চলাচল করি সেখানেও ব্যাড কমেন্ট শুনতে হয়।'

বাংলাদেশে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম নয়, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। কেউ জন্মগত আবার কেউ দুর্ঘটনার ফলে ব্যবহার করছেন হুইলচেয়ার। কিন্তু তাদের খুব একটা শহরে বেরুতে দেখা যায় না কারণ এই শহরের অবকাঠামো। এমন হওয়ার কথা ছিল না। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সকল ভবনই গড়ে উঠার কথা। আছে আইন ও বিধিমালা কিন্তু বেশিরভাগ ভবনেই নেই তার ব্যবহার।

ইন্সটিটিউট অফ আর্কিটেক্টের সভাপতি ড. খন্দকার শাব্বির আহমেদ বলেন, 'বাংলাদেশ র‍্যাম্প করার জায়গায় নেই তবে ছোট হাইড্রোলিক লিফ্টের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমাদের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড আছে সে অনুযায়ী অবকাঠামো না বানালে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। রাজউকের পাশ আনতে গেলে র‍্যাম্প আছে কিনা তা দেখা হয়।'

স্কুলটা বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য। কিন্তু এখানে যারা হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন তাদের বেশির ভাগই স্কুলে আসতে চায় না যাতায়াতে অসুবিধার কারণে। যারা আসেন, তাদের লড়াইটা বেশ কঠিন।

রমনা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাহমিনা পারভীন বলেন, 'হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যে শিশু বা ব্যক্তিরা রয়েছে আসলে তাদের জন্য আমাদের সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে। আমাদের বিশেষ স্কুল থেকে শুরু করে বাসস্থানে যাওয়া আসার জন্য তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা উচিত।'

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, বাণিজ্যিক সকল ভবনে সকল ধরনের বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য চলাচল নিশ্চিত করতে কাজ করছে তারা। নিয়ম না মানা হলে হবে জেল জরিমানা। আইন মানলেই শহর হয়ে উঠবে হুইলচেয়ারবান্ধব।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, 'শুধু তারা হুইল চেয়ার না লিফ্টেও যেন উঠতে পারে সেই জন্য এখন থেকে নতুন যেই ভবন হবে সেগুলোতে ম্যান্ডাটরি করা আছে। শপিংমল, হাসপাতাল যেখানে মানুষজন যাওয়া আসা করে সেখানেও যেন তারা যেতে পারে সেই বিষয়ে রাজউক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত হুইলচেয়ার ব্যবহার অনুপযোগী বললেন ঢাকার উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তবে এই শহরকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের উপযোগী করতে শুধু সরকার বা সিটি কর্পোরেশনের চেষ্টাই যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছেন তিনি। চান সকলের সহযোগিতা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের ঢাকা শহরে ক্যাপাসিটি ও ক্যাপাবিলিটি কোনোটায় নেই। আমরা পার্ক করেছি সেখানে কিন্তু তারা যেতে পারছে। তাদের জন্য আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হবে।'

নগরের অভিভাবক থেকে নাগরিক, সবার চাওয়াই হুইলচেয়ারবান্ধব হোক শহর, আর তাতে যে কেবল চলাচলের প্রতিবন্ধকতা কমবে তা নয়, বাড়বে অর্থনীতির কর্মশক্তিও।

ইএ

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর  

No Article Found!