মানবপাচার মামলায় ৫ বছরে নিষ্পত্তি ১৯ শতাংশ, যেখানে ৯৪% আসামিই খালাস

0

মানবপাচারের অপরাধে মামলা হলেও সাজা হয় না। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মানবপাচার আইনে দায়ের হওয়া মামলার মাত্র ১৯ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে। আর সাজা হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশের। অর্থাৎ ৯৪ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়েছেন। আইনজীবীরা বলছেন, স্বাক্ষীর অনুপস্থিতি আর বাদীকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে আপোষ-মীমাংসাসহ নানা কারণে খালাস পাচ্ছে আসামিরা। এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি না পেয়ে খালাস পাওয়ায় দৌরাত্ম্য বাড়ছে দালাল চক্রের, তাই দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিতের তাগিদ তাদের।

শরীয়তপুর জেলার নিয়ামতপুরের তুলাতলা গ্রাম। সেলিম জমাদ্দারের বাড়িতে চলছে পুত্র শোকের মাতম।

ভেবেছিলেন, ছেলে বিদেশ গেলে আসবে সুদিন। তাইতো এক বছর আগে, দালাল ধরে সারাজীবনের সঞ্চয় আর ধার-দেনা করে ১২ লাখ টাকায়, লিবিয়া পাঠান একমাত্র ছেলে রাশেদুলকে। তবে দুইমাসের মধ্যেই রাশেদুলকে জিম্মি করে চালানো হয় নির্যাতন, দাবি করা হয় মুক্তিপণ। উপায় না পেয়ে ছেলের জীবন বাঁচাতে দালালকে বিশ শতক জমি লিখে দেন সেলিম জমাদ্দার। তারপরও গত ৮ মাস ধরে প্রিয় সন্তানের সন্ধান না পেয়ে দিশেহারা তারা।

একই গ্রামের বাসিন্দা মধ্যবয়সী মান্নান মোড়ল। হোটেলে কাজ পাওয়ার আশায় এ বছরের শুরুতে গিয়েছিলেন লিবিয়া। কাজ দেয়ার পরিবর্তে উল্টো তার ওপরও করা হয় পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিপণের বিনিময়ে দেশে ফিরতে পারলেও সেই নির্যাতনের দুর্বিষহ স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায় তাকে। তার মতো এমন ভুক্তভোগী এই গ্রামে অনেকেই।

মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল। প্রতিদিনই মানব পাচার মামলায় বিচার প্রার্থী কিংবা আসামিরা হাজির হন আদালতে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন বলছে, গত সাড়ে ৫ বছরে মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৯শটি। সব মিলিয়ে বিচারের Sঅপেক্ষায় প্রায় ৪ হাজার মামলা। এসব মামলায় মোট আসামি প্রায় ৩৭ হাজার, এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে অর্ধেকের কম।

২০১২ সালের মানবপাচার দমন আইন অনুযায়ী, মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে ১৮০ দিনের মধ্যে। আর এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ৫ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া সংঘবদ্ধ চক্রের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন বা সর্বনিম্ন ৭ বছরের কারাদণ্ড পাবেন।

তবে গত সাড়ে ৫ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এসব মামলার নিষ্পত্তি কিংবা সাজার হার খুবই কম। কয়েক হাজার মামলা থাকলেও বিচারের মাধ্যমে মাত্র ৭৪৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে ৭০০টি মামলায় খালাস পেয়েছেন ২ হাজার ৬শ ২৭ জন। আর ৪৫ টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে মাত্র ১শ ৩৪ জনের।

নিষ্পত্তির হারে মাত্র ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ সাজা আর ৯৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ মামলার আসামি খালাস পেয়েছেন। এই আইনে ২০১৯ সালে ১৭ জনের যাবজ্জীবন সাজা হলেও পরের তিন বছর একজনেরও সাজা হয়নি। এছাড়া এখন পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড হয়নি কারো।

আইনজীবীরা বলছেন, এসব মামলার তদন্তে বড় প্রতিবন্ধকতা, দেশের বাইরে সংঘটিত অপরাধ প্রমাণ করা। তাছাড়া আদালতে সাক্ষী না আসা, বাদীকে ভয়-ভীতি কিংবা চাপ প্রয়োগ ও সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপোষের মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার করাই আসামি খালাস কিংবা সাজা কম হওয়ার বড় কারণ।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফয়সাল হাসান আরিফ বলেন, ‘সবচেয়ে মারাত্মক অংশ হচ্ছে অপরাধী যদি বুঝতে পারে অপরাধ করলেও তার সাজা হবে না তখন সে নিশ্চিন্তে অপরাধ করে। তো এখন অপরাধের বিচার না হওয়াও অপরাধ বাড়ার একটি কারণ।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুক্তভোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আইনগত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন, যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, ‘অপরাধী যারা রয়েছেন তারা যদি আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে যায়, তাহলে সে দায় ঘুরেফিরে রাষ্ট্রের কাধেই বর্তায়। এই পরিবারগুলোর আর্থিক পুনর্বাসন বা সহায়তার জায়গাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।’

আইনবিদরা মনে করেন, বিচারকদের ওপর মামলার অত্যধিক চাপ থাকাও সঠিক বিচার না পাওয়ার কারণ। মানব পাচার রোধে দ্রুত বিচার কার্যক্রমের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই কমে আসবে এ ধরনের অপরাধ।

এএইচ

আরও পড়ুন:
এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর
No Article Found!